দুনিয়ার জীবন

মানুষের দুনিয়ার জীবন অতি ক্ষুদ্র। এই দুনিয়াকে জ্ঞানীগুণীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপমা দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ বলেন, আমাদের হায়াত হলো ইকামত ও নামাজের মধ্যবর্তী যে সময় অবশিষ্ট থাকে, সে সময়টুকু। অর্থাৎ ইকামত ও নামাজের মধ্যবর্তী সময় এক মিনিট বা তার কম। প্রশ্ন হতে পারে, ষাট-সত্তর বছরের জীবনকে সামান্য সময়ের সঙ্গে কীভাবে তুলনা করলেন? আসলে এখানে আখেরাতের অফুরন্ত হায়াতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আখেরাতের অফুরন্ত হায়াতের তুলনায় দুনিয়ার হায়াত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র! অনেক গবেষক এর থেকেও কম বলেছেন।

কিন্তু সেই সময়টুকুই মানুষ কাটায় অবহেলায়, অবলীলায়। দুনিয়া জীবনে মানুষ যে পুণ্য করবে, সে প্রতিদান হিসেবে পাবে জান্নাত, যে খারাপ কাজ করবে সে পাবে জাহান্নাম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোনো সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।’ সুরা নিসা : ১২৪

অর্থাৎ যে পুণ্যের বিপরীত (খারাপ কাজ) করবে, সে জান্নাতের বিপরীত (জাহান্নামি) হবে। কোরআনে বলা হয়েছে, দুনিয়া হলো মানুষের জন্য ‘পরীক্ষার জায়গা।’ আর মানুষ হলেন পরীক্ষার্থী। মানুষের সুবিধার্থে সৃষ্টি করেছেন জীবজন্তু, গাছপালা। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।’ সুরা মূলক : ২

দুনিয়ায় মানুষকে পরীক্ষা করা হয় ক্ষুধা দিয়ে, ধনসম্পদ ক্ষতির মাধ্যমে, ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। এভাবে পরীক্ষার কথা আল্লাহতায়ালাই কোরআনে কারিমে বলেছেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।’ সুরা আল বাকারা : ১৫৫

কেউ কেউ দুনিয়াকে বিদেশের সঙ্গে উপমা দেন। তারা বলেন, দুনিয়া হলো আমাদের জন্য বিদেশ, অস্থায়ী ঠিকানা। দুনিয়া হলো কামাইয়ের জায়গা। যেভাবে মানুষ বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠায়। বাবা-মা, ভাই-বোন সেই অর্থ দিয়ে ঘর বানিয়ে রাখেন, যাতে আমরা বিদেশ থেকে এসে সুখে দিনাতিপাত করতে পারি। যদি কামাই করে কিছুই না পাঠাই, তাহলে দেশে এসে এর ফল ভোগ করতে হবে।

ঠিক তেমনি দুনিয়া হলো উপার্জনের জায়গা, কামাই করার জায়গা। দুনিয়া থেকে কামাই করে আখেরাতে পাঠাব। সেখানে উপার্জিত আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে, তিল পরিমাণ অত্যাচার করা হবে না। দুনিয়া থেকে ভালো কাজ করে পাঠালে জান্নাত লাভ করব, অন্যথায় কষ্ট ভোগ করতে হবে।

কেউ কেউ উপমা দেন, দুনিয়া কুড়িয়ে নেওয়ার জায়গা। ধরুন একজন ধনবান ব্যক্তি এক গরিব ব্যক্তিকে বলল, তুমি এই রুম থেকে যত ইচ্ছা সম্পদ ও টাকা-পয়সা যা ইচ্ছা নিয়ে নাও। তবে এই সুযোগ আজকের জন্যই। কালকে আর এই সুযোগ পাবে না। শত চেষ্টা করলেও এই সুযোগ আর মিলবে না। গরিব লোকটি রুমে ঢুকতে দেরি করল না। ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া! স্বর্ণ, রৌপ্য ভর্তি রুম। সে কিছুক্ষণ সেগুলো দেখল। ভাবল, পরে কুড়িয়ে নেব, আগে একটু দেখে নিই। পুরো দিন তো পড়ে আছে। হেঁটে হেঁটে সব দেখতে লাগল। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি স্বর্ণের বিছানা। সে ভাবল, পুরো দিন তো পড়ে আছে, একটু বিছানায় বিশ্রাম করি। ঘুম থেকে উঠে না হয় কুড়িয়ে নেব। এই ভেবে ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই দেখে দিন ফুরিয়ে গেছে। এখন সে শত চেষ্টার পরেও কিছু কুড়িয়ে নিতে পারেনি। দিন শেষে খালি হাতে রুম থেকে বের হলো।

ঠিক তেমনি আমাদের দুনিয়াতে পাঠানো হলো। বলা হলো, তোমরা দুনিয়াজীবনে যত ইচ্ছা কুড়িয়ে নেবে। আখেরাতে তার ফল ভোগ করবে। অন্যথা সাজা ভোগ করতে হবে। আমরা এই সময়টুকুকে কাটিয়ে দিচ্ছি অবহেলায়, অবলীলায় এই ভেবে যে আমাদের হায়াত তো পড়ে আছে। শেষ বয়সে কুড়িয়ে নেব। শেষ বয়সে আমল করব। হঠাৎ দেখে মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাঈল তার দরজায় কড়া নাড়ছে। আর সুযোগ হয়নি কিছু কুড়িয়ে নেওয়ার।