নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপ করছেন তাকে অর্থহীন মনে করছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য। গতকাল শনিবার তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ‘বৈধতা’ দিতে বিএনপি ওই সংলাপে যাবে না। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিএনপিকে যে চিঠি দিয়েছেন তার কোনো জবাবও দেবে না বিএনপি। কারণ বিএনপি শুধু সরকারকে নয়, দেশবাসীকেই জানিয়ে দিয়েছে। তাই রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর প্রয়োজন নেই।
গত ৫ জানুয়ারি বুধবার সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রপতির চিঠি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। চিঠিতে ১২ জানুয়ারি বিকেলে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিঠির বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের জানান, বুধবার দুপুর আড়াইটায় রাষ্ট্রপতির চিঠি তিনি গ্রহণ করেছেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যে অবস্থান নিয়েছি সেখান থেকে আর ফেরার উপায় নেই। এখন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি স্থায়ী কমিটির সভায়। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে আর জানানোর কোনো প্রয়োজন মনে করছি না।’ তিনি বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে তার চিকিৎসকরা সুপারিশ করেছেন। এ বিষয়ে বেগম জিয়ার পরিবার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে আবেদন করেছেন। কিন্তু সরকার অনুমতি দেয়নি। বরং তারা নেত্রীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রক্ষার প্রয়োজন মনে করছি না।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘অন্যান্য সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সংবাদ সম্মেলন করে রাষ্ট্রপতির সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। কী কারণে যাব না তাও জানিয়ে দিয়েছি।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সংলাপে আমরা অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরপর রাষ্ট্রপতি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমরা সংলাপে অংশ নেব না।’
রাষ্ট্রপতি সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়ে যে চিঠি দিয়েছেন তার উত্তর দেবেন কি না জানতে চাইলে মোশাররফ বলেন, ‘সরকার তার অবৈধ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে নাটক শুরু করেছে। এ নাটকের অংশ আমরা হব না। চিঠির উত্তরও দেব না। সরকার আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা। পাঁচশোর অধিক নেতাকর্মীকে গুম করেছে। তাদের সঙ্গে সৌজন্যতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এখন আমরা চেয়ারপারসনের মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে অনুমতি দেওয়ার দাবিতে জেলায় জেলায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। সেখানেও সরকার বাধা দিচ্ছে। কিন্তু নেতাকর্মীরা পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমাবেশ করছে। এখন আমাদের পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই।’
গত ২৭ ডিসেম্বর সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল সভা হয়। সভায় ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপে না যাওয়ার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। পরে গণমাধ্যমে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসি আওয়ামী লীগের দলীয় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পরপর দুটি ইসিই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলীয় সরকার বহাল রেখে ইসি কখনোই স্বাধীনভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারবে না। কারণ ২০১১ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান বলবৎ করে প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্র বিকাশের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। জনগণ তার ভোটের অধিকার হারিয়েছে।
বিএনপি ছাড়াও এ পর্যন্ত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), ইসলামী আন্দোলন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতিকে নতুন ইসি গঠন করতে হবে।