কারসাজিতে লাগামহীন সরকারি শেয়ার

হঠাৎ করেই সরকারি মালিকানাধীন প্রায় সব কোম্পানির শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করেছে। এক মাসে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের শেয়ারদর আড়াই গুণ হওয়ার পর এখন অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির সব শেয়ারে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অনেক বছর ধরে লোকসানে থাকা দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিও রয়েছে। মূলত কারসাজির মাধ্যমেই সরকারি কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকালও দরবৃদ্ধির তালিকায় সরকারি কোম্পানিগুলো শীর্ষ অবস্থানে ছিল।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, একজন প্রভাবশালী বড় বিনিয়োগকারীর নেতৃত্বে হঠাৎ করেই সরকারি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি শুরু হয়েছে। ওই চক্রটির প্রভাবে সরকারি প্রায় সবগুলোর দর লাগামহীনভাবে বাড়ছে। এখন ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারীর আকর্ষণের কেন্দ্রে এমন ১৭ কোম্পানির শেয়ার।

যদিও এক মাস আগেও রাষ্ট্রীয় ১৭ কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লস ছাড়া বাকিগুলোর তেমন চাহিদা ছিল না। এ দুই কোম্পানির দরবৃদ্ধি বাকিগুলোর দরবৃদ্ধিতে ইন্দন জুগিয়েছে। অতি পরিচিত একাধিক বড় শেয়ার ব্যবসায়ীর আগ্রাসী শেয়ার ক্রয়ের প্রভাব এসব শেয়ারে পড়েছে এমনটাই জানিয়েছেন বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ কর্মকর্তারা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এ দরবৃদ্ধির র‌্যালিতে যোগ দিচ্ছেন।

কারসাজিতে দর বাড়ায় সরকারি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনও বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে ১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ১৭ কোম্পানির ৩৮৭ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা মোট লেনদেনের প্রায় ২০ শতাংশ। এর মধ্যে পাওয়ার গ্রিডের কেনাবেচা হওয়া শেয়ারের বাজার মূল্য ছিল ১৩৩ কোটি টাকার বেশি।

বিপুল শেয়ার চাহিদা সৃষ্টির কারণে সরকারি সাত কোম্পানির শেয়ার দিনের সার্কিট ব্রেকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হয়েছে। শেয়ারগুলো হলো বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ডেসকো, ইস্টার্ন কেব্লস, ন্যাশনাল টিউবস, রেনউইক যজ্ঞেশ^র, তিতাস গ্যাস এবং উসমানিয়া গ্লাস। এসব শেয়ারের দর ৬ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত দর বেড়েছিল। গতকাল দরবৃদ্ধির শীর্ষে থাকা সরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইস্টার্ন কেব্লস, ন্যাশনাল টিউবস, উসমানিয়া গ্লাস রয়েছে লোকসানে। একাধিক বড় ব্রোকারেজ হাউজের প্রধানরা জানান, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি দিয়ে সরকারি শেয়ারের র‌্যালি শুরু। এক্ষেত্রে স্বল্প পরিচিত এক কারসাজির হোতা নেপথ্যে ছিল। গত বছরের মে মাসের শুরুতেও শেয়ারটি হাজার টাকায় কেনাবেচা হয়েছিল। গত নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে এ শেয়ারটির দর ৩ হাজার ৭৮০ টাকায় উন্নীত হয়েছিল।

তবে রাষ্ট্রীয় শেয়ারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের শেয়ারের দরবৃদ্ধি। গত বছরের ২০ ডিসেম্বরও শেয়ারটি ৫০ টাকার কমে কেনাবেচা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল শেয়ারটি কেনাবেচা হয়েছে ১২৭ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন সপ্তাহে শেয়ারটির দর ২৬০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কোম্পানিটির মুনাফা বৃদ্ধির তথ্য বড় ভূমিকা রাখে। বিশ^ব্যাপী জাহাজ ভাড়া বাড়ায় চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিএসসির আয়ে উল্লম্ফন দেখা দেয়। হঠাৎ মুনাফা বৃদ্ধিকে পুঁজি করে বিএসসির শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হচ্ছে। এ দরবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের প্রভাবশালী এক শেয়ার ব্যবসায়ীর হাত রয়েছে বলে জানান ব্রোকারেজ হাউজ কর্মকর্তারা।

তারা আরও জানান, ওই বিনিয়োগকারীর আগ্রাসী বিনিয়োগ চাপে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লস কোম্পানির শেয়ারদরও তিন সপ্তাহে ৪৫ শতাংশ দর বেড়ে এখন ২৫৬ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও বিনিয়োগ এ শেয়ারে বাড়ছে। কোম্পানিটিতে সরকারের শেয়ারমানি ডিপোজিটের বিপরীতে কত দরে কতটা শেয়ার ইস্যু করা হবে সম্প্রতি কোম্পানিটির এমন সিদ্ধান্ত প্রকাশের বড় ভূমিকা রাখছে। এসব শেয়ারের বৃদ্ধির রেশ বাকি সরকারি শেয়ারে পড়েছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে তিতাস গ্যাস, পাওয়ার গ্রিড, ডেসকোর শেয়ার।

এদিকে সরকারি শেয়ারের দরবৃদ্ধির প্রভাব পুরো শেয়ারবাজারেও পড়েছে। এক মাস পর ডিএসইর প্রধান সহৃচক ৭০০০ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। সোমবারের তুলনায় ৫৫ পয়েন্ট বেড়ে সূচকটি ৭০৪৯ পয়েন্টে উঠেছে। অবশ্য লেনদেনের মাঝে ১০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৭০৯৮ পয়েন্ট ছাড়িয়েছিল সূচকটি। গতকাল ১৮৯ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে, কমেছে ১৪৬টির এবং অপরিবর্তিত ৪৩টির দর। এদিন বীমা ছাড়া বাকি সব খাতের বেশিরভাগ শেয়ারদর বেড়েছে।