নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে সোমবার। আগের দুটি নির্বাচন কমিশন যেভাবে ‘সার্চ কমিটি’র মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল এবারও সেভাবে হবে, তবে এবার হবে ‘আইন’-এর অধীনে।
সংগত কারণেই দেশে কিছুদিন ধরেই নির্বাচন কমিশন নিয়ে কথাবার্তা চলছে। কেননা, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসেও সংবিধান অনুসারে নির্বাচন কমিশন আইন করা হয়ে ওঠেনি। তাই এই আলোচনা প্রকারান্তরে বাংলাদেশকে যেন তার জন্মকালে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। কথা উঠেছে, কেমন ধরনের নির্বাচন চাই, কেমন কমিশন চাই। জনগণ যখন তার রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়, তখন এই আলাপগুলো ওঠে। সত্তরের আগে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুও তাই তুলেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণেও তাই ছিল : ‘... কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পর বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এ দেশকে আমরা গড়ে তুলব।’
নির্বাচন কমিশনবিষয়ক বাহাস হলো সেই প্রাণভোমরা, যার মধ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিন্যাসসহ বাকি কথা লেপ্টে থাকে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মধ্যে যেমন পূর্ব বাংলার মুসলমান কৃষক ও তফসিলি সম্প্রদায়ের উত্থানের বীজ লুকিয়ে ছিল, তেমনি পাকিস্তানে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের মধ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জাগরণের। ১৯৫৪ আর ১৯৭০ সালের নির্বাচন তারই প্রমাণ।
২. বাংলাদেশ পর্বে সবচেয়ে সফল নির্বাচন হয়েছে ১৯৯১ সালে রউফ কমিশনের নেতৃত্বে। একই কমিশনের অধীনে মাগুরা নির্বাচনও হয়। একই কমিশন একটি নির্বাচন করে নির্দলীয় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সরকারের অধীনে, আরেকটি খালেদা জিয়ার দলীয় সরকারের অধীনে। কমিশন একই কিন্তু সরকার দুই ধরনের। নির্বাচনও হয় দুই ধরনের। একটি সুষ্ঠু আরেকটি কারচুপির। যার কারণে খুব সঠিকভাবেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাস্তায় নামে। নিশানা ঠিক করে যেখানে সব নির্বাহী ক্ষমতা জমা। বলা হয় নির্বাচন কেমন হবে, তা ঠিক করে সরকার প্রধান যেমন চান, তার ওপর। যেমন হুদা কমিশন, যার হাতে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনও হয়েছে, আর এই নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনও হলো।
তবু সেই কমিশন গঠন নিয়েই কথা। রউফ কমিশন কি খুব বেশি অতীত হয়ে গেছে? না হয়নি। রউফ কমিশন সামনে থাকার পরও শুধু নির্বাচন কমিশন নিয়ে কথা বলা বাতুলতা। তবু বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রপতি সীমিত ক্ষমতা নিয়ে আর কী কী করতে পারেন, তার সম্ভাবনা যাচাই করছেন। যদিও সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অভিজ্ঞতা জাতির আছে। যার মাজার জিয়ারত না করার স্বাধীনতাটুকুও ছিল না।
নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলো মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত। বিএনপি ও তার জোটভুক্তরা চায়, শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন। অন্যদিকে নবগঠিত রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন, গণসংহতি ও গণ-অধিকার পরিষদ নামে তিনটি পার্টিও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। সঙ্গে চায়, যে কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, তার কারণ সংস্কার। জি এম কাদেরের জাতীয় পার্টিও সম্ভবত এই সংস্কার চায়। অন্যদিকে সিপিবি-বাসদই শুধু ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে চায়।
সংসদের কাছে সবার জবাবদিহি করার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর কাছেই সবাই জবাবদিহি করেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও জনগণের বদলে শুধু তারই আজ্ঞাবহ থাকেন। অর্থবিল বা বাজেটে গত বছরের হিসাব জনগণকে দেওয়া হয় না। কেন সংসদে সব পার্টির প্রতিনিধিত্ব থাকে না এসব প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি।
অন্যদিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮(১)-এর ‘তবে এই সকল নীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়’ এবং অনুচ্ছেদ ৮০(৩)-এর ‘এবং সেই সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না’ শর্ত দুটিকে একসঙ্গে পাঠ করলে যেকোনো পাঠকের বুঝ হবে, রাষ্ট্রের মূলনীতি আর আয়-ব্যয়-বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও জনগণের নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এমনি করেই পাঁচ ভাগ ধনীর হাতে ২৭ ভাগ সম্পদ চলে গিয়েছে। কিন্তু আমরা প্রশ্ন তুলতে পারিনি যে, রাষ্ট্র কেন মূলনীতি অনুসারে চলছে না? মৌলিক অধিকারের ১৮টির মধ্যে ১৫টিই ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের প্রচলিত আইনের হাতে বন্দি।
৩. ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব কাজই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করেন। এমনকি নিয়োগ দিতে পারলেও বরখাস্ত করার এখতিয়ারটুকুও তার নেই। সেই তিনি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে পারবেন কি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া? ৫৫(২) ও (৪) অনুসারে যে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের পরামর্শ ও বরখাস্তের ক্ষমতা রাখেন, তার কথাই তারা শুনবেন। এই কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন দল জাতীয় নির্বাচনে কখনো হারেনি। তাহলে আর নির্বাচন কমিশন নিয়ে অত কথা কেন?
নির্বাচন কমিশন তো দরকার, যা সর্বস্তরে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারে। যখন তারা নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবে। প্রধানমন্ত্রীর পদে সব ক্ষমতা রেখে কি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সম্ভব? বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার দিতে পারে, যখন নির্বাহী বিভাগ থেকে তা স্বাধীন হয়।
বিএনপি সম্ভবত এই কারণে নির্বাচন কমিশন নিয়ে রা করছে না। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান গঠনের সঙ্গে এক পদে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকার কী সম্পর্ক, তা তারাও খোলাসা করছে না। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির বদলে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হয়েছে হুবহু ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারির কপি। ১৩ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকেও পরিবারতন্ত্রের বাইরে আসার হুঁশে পৌঁছায়নি বিএনপি।
মিয়ানমারে সুচির দল ক্ষমতার বাইরে এখন। যখন ক্ষমতায় ছিল তখন জাতিগত নিপীড়নে তারাও কম ছিল না। কিন্তু যেই নিজেরা নিপীড়নের শিকার হলো তখনই তারা ক্ষুদ্র জাতিগুলোর সঙ্গে জোট করল। সম্প্রতি তারা যে ছায়া সরকার করেছে, সেখানে তারা রোহিঙ্গা, কাচিন জাতির প্রতিনিধিও রেখেছে।
তেমনি বিএনপিও বৃহৎ দল হিসেবে গত ১২ বছর থেকে শিক্ষা নিতে পারত। এক পদে সব ক্ষমতা থাকার ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব হয়ে ওঠায় দল হিসেবে বিএনপি সংকটের অভিজ্ঞতায় যা শিখল, তা থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারত।
লেখক : রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি
nahidknowledge@gmail.com