চলে গেলেন জনপ্রিয় গুপ্তচর চরিত্র ‘মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন। থামল অসংখ্য পাঠকের প্রিয় ‘কাজীদার’ কোলাহল। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
কাজী আনোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ মাসুমা মাইমুর গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছরের অক্টোবরে বাবার প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে। মাঝে পাঁচবার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তারপর ব্রেইন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক হয়। ১০ জানুয়ারি থেকে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গতকাল বিকেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মাইমুর হোসেন এবং মেয়ে শাহরীন সোনিয়াকে রেখে গেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন আগেই মারা যান। ফরিদার এক বোন খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। তাদের আরেক বোন প্রয়াত সংগীতশিল্পী নীলুফার ইয়াসমিন।
কাজী আনোয়ার হোসেনের পরিবার থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল মরদেহ বারডেমের হিমঘরে থাকবে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে সেগুনবাগিচার বাসায় মরদেহ নেওয়া হবে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাদ জোহর বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে। এর আগে সেগুনবাগিচা মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর কোনো আনুষ্ঠানিকতা করা হবে না।
একাধারে অনুবাদক, প্রকাশক, চিত্রনাট্যকার ও সংগীতশিল্পী ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসেবে তিনি ষাটের দশকের মধ্যভাগে ‘মাসুদ রানা’ নামক গুপ্তচর চরিত্র সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে তার সৃষ্টি ‘কুয়াশা’ নামের আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র পাঠকমহলে আলোচিত হয়। ‘বিদ্যুৎ মিত্র’ ও ‘শামসুদ্দীন নওয়াব’ ছদ্মনামেও বই লিখেছেন তিনি। সেবা প্রকাশনীর প্রকাশক এবং এই প্রকাশনার সিরিজ মাসুদ রানার লেখক হিসেবে নন্দিত ছিলেন তিনি। সবার কাছে হয়ে উঠেছিলেন ‘কাজীদা’। ব্যক্তিজীবনে কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন রহস্যময় চরিত্র। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তাকে খুব একটা দেখা যেত না, গণমাধ্যমও এড়িয়ে চলতেন। তাকে নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে নানা রকম গল্প।
১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্ম। তার বাবা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন ও মায়ের নাম সাজেদা খাতুন। সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর আনোয়ার হোসেন আইএ ও বিএ পাস করেন জগন্নাথ কলেজ থেকে। এরপর বাংলায় এমএ ডিগ্রি নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পড়াশোনা শেষ করে গানে মনোযোগী হয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। তার তিন বোন সন্্্জীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন তখন শিল্পী হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সিনেমায় প্লেব্যাকও করতেন। ১৯৬২ সালে বিয়ে করেন কণ্ঠশিল্পী ফরিদা ইয়াসমিনকে।
ষাটের দশকে প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সেগুনবাগিচায় নিজেদের বাড়িতে গড়ে তোলেন সেগুনবাগান প্রেস। সেটাই পরে নাম পাল্টে হয় সেবা প্রকাশনী। সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমেই পেপারব্যাক বই বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পায়। গোয়েন্দা সিরিজ কুয়াশা দিয়ে সেগুনবাগান প্রকাশনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে আসে মাসুদ রানা সিরিজ। ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ডের আদলে গড়ে তোলা মাসুদ রানার সব বই বিদেশি বিভিন্ন থ্রিলারের ছায়া অবলম্বনে লেখা। মাসুদ রানা সিরিজের কয়েক শ বই বের হলেও এর অনেকগুলো নিজে লেখেননি কাজী আনোয়ার হোসেন। ‘ঘোস্ট রাইটার’ হিসেবে অন্যরা লিখতেন, তবে লেখকের নাম যেত কাজী আনোয়ার হোসেন। এ নিয়ে শেষ জীবনে বিতর্কও সঙ্গী হয়েছিল কাজী আনোয়ার হোসেনের। সেবা প্রকাশনীরই লেখক শেখ আব্দুল হাকিম মাসুদ রানার স্বত্ব দাবি করলে বিষয়টি আদালতেও গড়িয়েছিল। শেষে হাইকোর্ট মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি এবং কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে মালিকানা স্বত্ব শেখ আবদুল হাকিমকে দিয়ে আদেশ দেয়। অধিকাংশ বইয়ের মালিকানা হারালেও ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের স্রষ্টা হিসেবে চরিত্রটি কাজী আনোয়ার হোসেনের মালিকানায় থাকবে বলে সিদ্ধান্ত দেয় কপিরাইট অফিস।
১৯৭৪ সালে মাসুদ রানার প্রথম চলচ্চিত্রায়ন ঘটে সিরিজের ‘বিস্মরণ’ বইটি নিয়ে। মাসুদ রানার ভূমিকায় এসেছিলেন সোহেল রানা, সেটাই এই চিত্রনায়কের প্রথম সিনেমা। আর মাসুদ রানার জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতার জন্য বাচসাস পুরস্কার পান কাজী আনোয়ার হোসেন। এ ছাড়া মাসুদ রানা সিরিজের ‘পিশাচ দ্বীপ’ নিয়ে আতিকুল হক চৌধুরী তৈরি করেন নাটক প্রাচীর পেরিয়ে, যাতে মাসুদ রানার ভূমিকায় ছিলেন নোবেল, তার সঙ্গী সোহানা হয়েছিলেন বিপাশা হায়াৎ। মাসুদ রানাকে নিয়ে আরও দুটি চলচ্চিত্র এখন নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে। মাসুদ রানার পাশাপাশি অনেক বই অনুবাদও করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। তার সম্পাদিত ‘রহস্য’ পত্রিকাটিও বেশ জনপ্রিয় সাময়িকী। পরে বের করেন কিশোর পত্রিকা।