উন্নয়ন ভাবনায় শুধু আর্থিক কিংবা অবকাঠামোগত উন্নতির দিকে চোখ ধাঁধানো দৃষ্টি দিয়ে নয় যে কোনো উন্নয়নকে ধারণ করতে, টেকসই করতে পথ পন্থা পদ্ধতির উন্নয়ন বা সংস্কারের ব্যাপারেও সমান সক্রিয় হওয়া আবশ্যক। উন্নয়ন শুধু ব্যক্তি বা দলীয় বা গোষ্ঠীর বা নিজেদের সময়কালের সীমানায় বাঁধার বিষয় নয়। প্রবহমান সময়ে সবার মধ্যে সেই উন্নয়ন অভিযাত্রায় শামিল বা বেগবান করতে স্বভাব সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। শোষণ বঞ্চনার পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সংঘবদ্ধ আন্দোলন যেমন প্রয়োজন ছিল, সেই অর্জনকে আত্মস্থ করতে সবাইকে সেভাবে সংশ্লিষ্ট করতে না পারলে পক্ষ-বিপক্ষের বেড়াজাল বিতর্কে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
এশিয়ারই একটি দেশ, সমুদ্রমেখলা, দ্বীপপুঞ্জ দেশ জাপান। দেশটিতে প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন নেই বরং আছে প্রকৃতির বিপর্যয়ের নিত্য সমূহ সম্ভাবনা। সে বিপর্যয় মোকাবিলায় দেশটি প্রায়শ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। কিন্তু জাপানি জাতির অন্তর্নিহিত এমন কিছু স্বভাব সংস্কৃতি তাদের আত্মশক্তিকে বলবান বেগবান রাখে। মোটা দাগে এমন আহামরি গোছের কোনো কিছু নয়, তথাপি এমন কিছু মৌল বৈশিষ্ট্য তারা ধারণ করে যা তাদের সংকট সন্ধিক্ষণেও শিরদাঁড়া উঁচু রাখে, পরিত্রাণের পথ পেতে কষ্ট হয় না। আমাদের সঙ্গে তাদের সে সব স্বভাব সংস্কৃতির তুলনায় গেলে বোঝা যাবে উভয় দেশের উন্নয়ন উপলব্ধির অবয়ব।
সময়ানুবর্তিতা : জাপানিরা অত্যন্ত সময় সচেতন। নির্ধারিত সময়ে সব কিছু শুরু ও শেষ করা এবং সময়ের সদ্ব্যবহারের ব্যাপারে তারা শুধু সচেতনই নয় তা অনুসরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো সভায় যদি ১০টায় হাজির হওয়ার কথা থাকে তাহলে ঠিক ১০টায় সেখানে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট সময় হাতে নিয়েই তারা রওনা হবে। কোনো কারণে যদি কারও মনে হয় ট্রাফিক জ্যাম কিংবা দৈব দুর্বিপাকের জন্য পৌঁছাতে কয়েক মিনিট বিলম্ব হতে পারে তাহলে সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফোনে জানিয়ে দেওয়া হবে সভা আয়োজকদের এভাবে যে, ‘আমার আশঙ্কা আমার কয়েক মিনিট দেরি হবে’। এটা জানানো বাধ্যতামূলক এ জন্য যে কেউ কোনো সভায় বা কাজে বিলম্ব করে এলে সেটি একধরনের বেয়াদবি বা অভদ্র আচরণের মতো অপরাধ বলে ধরে নেওয়া হবে। তাছাড়া এই দেরির কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আসার পথে কোনো বিপদ হলো কি না এ রকম আশঙ্কা বা দুশ্চিন্তায় কাউকে ফেলা কোনো কারণেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে তারা মনে করে। আপনার বাসায় যদি কোনো জাপানির দাওয়াত থাকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে সে আসবে ঠিক ৬টা ৩০ মিনিটেই। আগেও না পরেও না। আগে তারা রওনা দিয়ে আপনার বাসায় যদি ২/৫ মিনিট আগে পৌঁছায়ও তবে তারা আপনার বাড়ির আশপাশে হাঁটাহাঁটি করে সময় পার করে ঠিক ৬টা ৩০ মিনিটেই আপনার দরজায় হাজির হবে। যথাসময়ে সব আমন্ত্রিত অতিথি একত্রে আসায় আপ্যায়নসহ সব ব্যবস্থাপনায় কোনো বিঘ্ন বা ব্যাঘাত ঘটে না। সময়ানুবর্তিতার কারণে অফিসে আদালতে কলকারখানায় সব ক্ষেত্রেই কারোরই সময়ের অপচয় হয় না। সময়ের অপচয়জনিত কারণে উৎপাদন ও সরবরাহের কোনো প্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না। সময়ের সদ্ব্যবহারের সুফলে গোটা দেশ জাতি সমাজ উপকৃত হচ্ছে। পাঁচ বছরের প্রকল্প পনেরো বছরে শেষ করতে না পারার মাশুল তাদের গুনতে হয় না।
যথাসময়ে আহার : জাপানিরা সকাল ৭টায় প্রাতরাশ, দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মধ্যাহ্নভোজ এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে নৈশভোজ সারবেই। এর কোনো ব্যত্যয় তারা করবে না। যত কাজ থাকুক যত ব্যস্ততা থাকুক যত সমস্যা থাকুক যথাসময়ে আহার করার ক্ষেত্রে এই শৃঙ্খলা বোধ তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আবশ্যিকভাবে নির্দিষ্ট সময় অস্তে আহারের ফলে তাদের পরিপাক প্রক্রিয়ায় কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় না এবং আহারের সময়ের জন্য তাদের নির্ধারিত সময় সবাই মিলে সমানভাবে সদ্ব্যবহারের সুযোগ পায়। ঠিক খাওয়ার সময়টাতে তাদের কেউই অন্য কোনো কাজে ব্যাপৃত হয় না। এটা সবারই জানা। এর ফলে একটা প্রচন্ড শৃঙ্খলাবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের সংসার ও সমাজজীবনে।
পরিমিত আহার : একজন জাপানি দৈনিক কী পরিমাণে খাবার খাবে অর্থাৎ ক্যালরি মাপে তার পরিমাণ নির্ধারিত আছে তার স্বাস্থ্য বিষয়ক নথিতে। সকালে দুপুরে ও রাতে সে মোট মিলিয়ে ঐ নির্ধারিত পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করবে। ধরা যাক শিরাই সান (মি. শিরাই। জাপানিরা মি. মিসেস সবাইকে ‘সান’ সম্বোধন করে) এর বয়স এখন ৭৫ বছর। তার ওজন ৬০ কেজি। উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। বয়স, ওজন ও উচ্চতার মাপকাঠিতে ডাক্তারের পরামর্শমতো তার দৈনিক ১৮৩৫ ক্যালরির খাবার খাওয়া উচিত। সিরাই সান সকালে যে ভাত ও স্যুপ সবজি খেয়ে থাকেন তার খাদ্যমান হলো ৫২০ ক্যালরি। দুপুরে তিনি অফিসের পাশে খাবারের দোকান থেকে ‘অবেন্তো’ (খাবার প্যাকেট যাতে সুষম সব খাবার আইটেম সাজানো থাকে) খাবেন। ঐ প্যাকেটের নিচে ছোট করে লেখা আছে এ খাবারগুলোর ক্যালরির পরিমাণ। ধরা যাক এটির পরিমাণ ৭৫০ ক্যালরি। সকালে ৫২০ এবং দুপুরে ৭৫০ মিলে ১২৭০ ক্যালরি। সিরাই সান সন্ধ্যায় (১৮৩৫-১২৭০)= ৫৬৫ ক্যালারি পরিমাণ খাবার খাওয়ার জন্য বেছে নেবেন। সিরাই সান যদি জানেন রাতে তার কোথায়ও দাওয়াত আছে তাহলে দুপুরে তিনি কিছুটা কম ক্যালরির খাবার খাবেন যাতে রাতে একটু বেশি খেলেও যোগফল ঠিক থাকে। এভাবে মেপেজোখে খাওয়াতে তাদের শরীরে গোলমাল প্রায়ই দেখা যায় না। নির্ধারিত মাত্রার খাবার গ্রহণের কারণে শরীরের মধ্যে যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় তা তাকে সবল সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।
খাবারের গুণাগুণ বিচার : জাপানিরা খাবারের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত উপাদানের উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। গবেষণা করে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় গুণাগুণ সম্পন্ন খাদ্য আইটেমকে লোভনীয় দর্শনীয় করে খাবার উপযোগী করে তোলে। যেমন শিমের বিচি অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাদ্য উপাদান। কিন্তু শিমের বিচি সব সময় রান্নার জন্য তৈরিতে বেশ ঝামেলা। তারা গবেষণা করে এই শিমের বিচি থেকে নির্যাস নিয়ে ‘তফু’ নামে পনির, দধি জাতীয় খাবার তৈরি করেছে। এটি সব দোকানে পাওয়া যায়। খাবার আইটেমের মধ্যে ‘তফু’ থাকবেই। সমুদ্রের উপকূলে যে শ্যাওলা (ঝবধ বিবফং) পাওয়া যায়। তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে তাকে শুকিয়ে পেস্ট করে ‘নরি’ নামের একটা খাবার তৈরি হয়। ভাতের সঙ্গে পেঁচিয়ে দেওয়া হয় নরি। ‘নরি’ খেলে মাথার চুলের বিশেষ উপকার হয়। জাপানিরা খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য উপাদান তৈরি ও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণা করে। তারা বেশি খাবার খাবে না তবে যারা যেটুকু খাবে তা অবশ্যই উপাদেয় ও গুণগতমান সম্পন্ন। তারা গুরুপাক কিংবা অতি সেদ্ধ খাবার খায় না। তারা মনে করে অধিক মসলা ব্যবহার কিংবা অতি সেদ্ধ হওয়ার ফলে খাদ্যের গুণগত মান বা ফুড ভ্যালু হ্রাস পায়। তারা কাঁচা মাছ প্রসেস করে খেতে ভালোবাসে। সবজি সরাসরি খাওয়ার পক্ষপাতী তারা। যথাসময়ে আহার, পরিমিত আহার এবং খাবারের গুণগত মান মেনে চলায় সেদেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় ও বাজেটের সঙ্গে আমাদের পার্থক্যটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
আপন মনে নিমগ্ন : জাপানিরা স্বল্পভাষী এবং আপনার মধ্যে শক্তি ধরতে আগ্রহী। তারা অপরিচিত কারও সঙ্গে অকারণে অহেতুক কথা বলা বা আলাপচারিতা পছন্দ করে না। এমনকি পরিচিত জনের সঙ্গে মেপে মেপে কথা বলে। তারা জানে ও মানে যে বাহুল্য কথায় নিজের শক্তি ও বল ক্ষয় হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন জাপানিরা বাজে কথায় সময় নষ্ট করে না। তারা শক্তি সঞ্চয় করতে জানে তাই প্রয়োজনের সময় টানাটানি পড়ে না। ধরুন আপনি সহযাত্রী হয়ে বাসে বা ট্রেনে কোথাও যাচ্ছন। আপনার পাশে যিনি বসেছেন তাকে আপনি তেমন চেনেন না। আমাদের দেশে অনেকে আগ বাড়িয়ে সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতে ওঠে। অতিকথনে নিজের শারীরিক শক্তির ক্ষয় যেমন তেমনি এসব কথাবার্তার মাধ্যমে অনেক বিব্রতকর তথ্য আদার প্রদানে সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। একজন জাপানি কখনো এটা করবে না। জাপানি বাসে কিংবা ট্রেনে যাত্রার কালে অধিকাংশ সময়ে চোখ বুজে থাকবে মনে হয় ঘুমুচ্ছে। আসলে সে শক্তি বা বল সঞ্চয় করছে। ভবিষ্যতে কোনো কিছু করার পরিকল্পনায় চুপ হয়ে আছে। যদি সে এ সময় বই বা খবরের কাগজ পড়ে তবে তা পড়বে অত্যন্ত যতনে খবরের কাগজ যাতে অন্যের গায়ে না লাগে কিংবা খবরের কিছু অংশ অন্যের পাঠ দৃষ্টিতে যাতে না আসে। কেননাতারা ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সৌজন্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্নবান।
নিয়মিত বাধ্যতামূলক ব্যায়াম : জাপানিরা শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অফিসে কাজ শুরুর আগে সংগীতের তালে কিছুটা শরীর সঞ্চালন, সকাল ১১টার দিকে ১০/১৫ মিনিটের হাল্কা ব্যায়াম থাকবেই। তাদের বাসাবাড়ি এবং অফিস থেকে কাছাকাছি বাস স্টপেজ কিংবা রেলস্টেশন সচরাচর এমন দূরত্বে থাকে যে ন্যূনতম ৫/১০ মিনিট হাঁটা তার অবশ্যিকভাবে হয়েই যায়। এটা তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কর্মসূচির অঙ্গ। জাপানিরা জুজুৎসু, কারাতে, কুংফু জাতীয় শরীরচর্চা তথা আত্মরক্ষার কৌশল বা অর্জনকে ব্যায়াম হিসেবে ব্যবহার করে। শরীর দেহ ও মনের পরিশুদ্ধির জন্য তারা গরম পানিতে গলা ডুবিয়ে গোসল করতে ভালোবাসে। অনসেন বা প্রাকৃতিক ঝরনা কিংবা পাবলিক বাথ বা অফুরোতে তারা দলবেঁধে গরম পানিতে গোসল করতে যায় সপ্তাহান্তে।
লেখক সরকারের সাবেক সচিব। এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান
mazid.muhammad@gmail.com