করোনাভাইরাস মহামারীর রেশ যেন কাটছেই না। বিশ্বব্যাপী এই মহামারীর প্রকোপ চলছে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে। প্রতিনিয়ত এই ভাইরাসটি রূপ পরিবর্তন করে মানবদেহে সংক্রমিত হচ্ছে। বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরাও এই ভাইরাসটির সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না।
এর আগে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকার পাশাপাশি ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে মতপ্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ মেনে বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের পথেই হাঁটছিল অনেকে, বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো। কিন্তু সেই আশা অনেকটাই মøান করে দিয়েছিল করোনার ডেল্টা ধরন। এর পরও সংক্রমণ রোধে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে যে ক্ষীণ আশা ছিল, তা-ও এখন নিভতে বসেছে ওমিক্রনের তাণ্ডবে।
উল্লেখ্য, নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠী টিকা নিয়ে কিংবা রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর যখন তাদের দেহে কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়, তখন পরোক্ষভাবে ওই পুরো জনগোষ্ঠী রোগটি থেকে সুরক্ষিত থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছে, ওমিক্রন করোনাভাইরাসের পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সংক্রমণ ঠেকাতে করোনার বিরুদ্ধে তথাকথিত হার্ড ইমিউনিটির ধারণা সহায়ক হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ওমিক্রন এতটাই সংক্রামক যে এতে টিকা নেওয়া ব্যক্তিরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। আর এটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ, মিউটেশনের মাধ্যমে করোনাভাইরাস মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করার উপায় খুঁজে বের করতেই থাকবে।
পক্ষান্তরে কিছু কিছু গবেষক ও বিজ্ঞানী আশার বাণী শোনাচ্ছেন। তারা বলছেন, ওমিক্রনের মাধ্যমে এই মারণ মহামারীর সমাপ্তি ঘটতে পারে। ওমিক্রনের থাবায় দেশে দেশে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর একেই সাপে বর মনে করছেন তারা। তাদের মতে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শেষপর্যায়ে চলে এসেছে অর্থাৎ করোনা মহামারী বিদায় নিতে চলেছে বিশ্ব থেকে। ডেল্টার তুলনায় কমপক্ষে পাঁচ গুণ দ্রুত ছড়াচ্ছে ওমিক্রন। প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তবে যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের মধ্যে রোগের লক্ষণ কিন্তু তেমন প্রকট নয়। সর্দি-জ্বর, গলাব্যথা, কাশি সাধারণ ফ্লু’র মতোই উপসর্গ। শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এ রকম কোনো সমস্যার কথা এখনো পর্যন্ত শোনা যায়নি। কোনো কোনো গবেষক বলছেন, ওমিক্রন শরীরের যে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করবে তাতেই কমে যাবে মহামারী। একে ‘এন্ডেমিক স্টেজ’ বা শেষের শুরু হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। যে সময় একটা পুরো জনজাতি ভাইরাসকে সঙ্গী করেই বাঁচতে শিখে যায়, তখন তাকে ‘এন্ডেমিক স্টেজ’ বলা হয়। মহামারী বা এপিডেমিক পর্যায়ে সাধারণত ভাইরাস একটা জাতির ওপর চেপে বসে। ‘এন্ডেমিক’ পর্যায়ে এসে ভাইরাসকে সঙ্গী করেই বাঁচতে শিখে যায় মানুষ। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব ক্রমেই সে পথেই অগ্রসর হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
মহামারীর প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। উন্নত দেশগুলো সবার আগে টিকাদান শুরু করে অনেক জীবন রক্ষা করতে পেরেছে। ধীরে ধীরে টিকাদান বেড়েছে উন্নয়নশীল দেশেও। টিকা গ্রহণের কারণে সংক্রমিতদের অনেকে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যু থেকে রক্ষা পান। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, এই ভাইরাসের নিত্যনতুন ধরনগুলোও অভিযোজিত হয়ে টিকার সুরক্ষাকবচ ফাঁকি দেওয়ার শক্তি অর্জন করেছে।
প্রথম দিকে সংক্রমণ রোধে সর্বাত্মক লকডাউন ও শাটডাউন ঘোষণা করা হলেও এখন আর তেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। সামগ্রিক অর্থনীতির কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। যার আরেক অর্থ দাঁড়ায়, সংক্রমণ রেখার ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধ থেকে আমরা পুরোপুরি সরে আসছি। বরং গুরুত্ব পাচ্ছে রোগীর সুচিকিৎসার দিকটি। সন্দেহ নেই, এসব বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। কিন্তু জলবায়ু বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা যায়, আমরা এখন ‘অভিযোজনশীলতা’ তৈরির দিকে ঝুঁকছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য : সংক্রমিতের বাড়তি সংখ্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি। আসল উৎস বা সংক্রমণ বিস্তার রোধ নয়।
তবে এই কৌশল আগামী সপ্তাহ বা মাসগুলোর বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হতে পারে। এ সময় যদি হাজার হাজার ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করে, তাহলে স্বাস্থ্য খাত আবারও বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই সতর্কতা ও সচেতনতা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অতি অবশ্যই টিকাকরণকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখনো আমাদের দেশে প্রায় অর্ধেক মানুষ টিকার আওতার বাইরে রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব জনসংখ্যার অন্তত ৭০ ভাগকে টিকাকরণের আওতায় আনতে হবে। আর অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মাস্ক ব্যবহার, দূরত্ব বজায় রাখা, আক্রান্তদের আলাদা রাখা, মোটামুটি এ ব্যবস্থাগুলোই গুরুতর সংকট থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন, ওমিক্রন যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে খুব অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এটির সংস্পর্শে আসবে। একবার যথেষ্টসংখ্যক মানুষ এর সংস্পর্শে এলে আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও নতুন হুমকির সঙ্গে পরিচিত হবে। ফলে মৃত্যুসংখ্যা সীমিত রেখেই মানবজাতি ভবিষ্যৎ ভ্যারিয়েন্টগুলো মোকাবিলার সুযোগ পাবে। তবে একে চূড়ান্ত উপসংহার মনে করা যাবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, করোনাভাইরাসের চরিত্র নিয়ে এখনই নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না। এমনও হতে পারে, আগামীতেও ওমিক্রনের মতো অতি-সংক্রামক বা ডেল্টার মতো প্রাণঘাতী ভ্যারিয়েন্ট হানা দেবে। তেমন পরিস্থিতির জন্যও আমাদের তৈরি থাকতে হবে। ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাতে হবে।
গত ২৪ মাসের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও বিশ্ববাসী টিকে আছে। দিন যতই যাচ্ছে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রেখে করোনাভাইরাস মোকাবিলার নিত্যনতুন কৌশলও মানুষ বের করছে। তাই তো ওমিক্রনের ভয়াবহ তাণ্ডবের মধ্যেও আমরা মহামারীর আগের সময়ের মতো অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারছি।
করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ যেভাবে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করে মোকাবিলা করা হয়েছে, চলমান তৃতীয় ঢেউও যৌথতার শক্তির ওপর নির্ভর করে সামলাতে হবে। যৌথতার শক্তিই পারে যেকোনো দুর্যোগ সামাল দিতে।
আরেকটি কথা, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে খারাপ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার কৌশল ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উন্নয়নের দর্শনে ‘রেজিলিয়েন্স’ বা লড়াই করার, টিকে থাকার কৌশল ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা না হলে ঝড়, বন্যা, অসুস্থতা, মহামারী যেই দুর্যোগই আসুক না কেন, এক শ্রেণির মানুষ তাতেই সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। এই শ্রেণিটির মধ্যে ‘রেজিলিয়েন্স’ তৈরিই হোক আমাদের আগামীদিনের প্রধান আরাধ্য।
চলমান মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্রের নাম বিবেচনাবোধ ও কাণ্ডজ্ঞান। কোথায় যাব, কীভাবে যাব, আর কোথায় যাব না, সেই সিদ্ধান্তটি বিচার-বিবেচনা করে নিতে হবে। ভাইরাসটি যেন ‘সুপারস্প্রেডার’ হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সুবিবেচনাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
সুবিবেচনা দরকার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রেও। করোনা মহামারীতে সব খাতে সমান ক্ষতি হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি খাত মহামারীকালে আরও শক্তিশালী হয়েছে। পর্যটন প্রায় শুয়ে পড়েছে, হোটেল ব্যবসা প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। নির্মাণ খাত থেকে সংগঠিত খুচরা বিপণন, এক একটি খাতের ওপর মহামারীর প্রভাব এক এক রকম। এই খাতগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে, শুধু অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কথা ভেবেই নয়, সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ আর্থিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেও এই খাতগুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার।
শুধু ঋণের প্রতিশ্রুতি, অথবা প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করলেই হবে না, কোন ক্ষেত্রে ঠিক কী প্রয়োজন, তা জেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। লকডাউন না করার সিদ্ধান্তটিই অর্থব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য যথেষ্ট নয় ক্ষেত্র অনুযায়ী সুবিবেচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। না হলে ভাইরাসের মারণলীলা থামলেও অর্থব্যবস্থার প্রলয় বন্ধ হবে না।
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com