নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে আলোচনা জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গেছে। এই সংসদে যারা গেছেন তাদের অধিকাংশ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি না হওয়া সত্ত্বেও সংসদে যে আলোচনা হয়েছে, এটাকেই অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এই আইনটি যে দেশের নির্বাচনী জালিয়াতির অবসানে কোনোই ভূমিকা রাখতে পারবে না সেটা জেনেও কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, ত্রুটিপূর্ণ হলেও দেশে যে একটা আইন হচ্ছে এটাই নাকি বড় পাওয়া। কিন্তু যে আইন দেশের মানুষের লুণ্ঠিত অধিকার ফিরে পেতে কোনো ভূমিকা রাখবে না, বরং আগের বেআইনি কারবারকে দায়মুক্তি দেবে সে আইন কেন গ্রহণ করতে হবে? তাড়াহুড়ো করে নিজেদের আখের গোছানোর জন্য স্টেকহোল্ডারদের কোনো মতামত না নিয়ে সরকার একটি আইন চাপিয়ে দিলেই তা মানতে হবে কেন?
নির্বাচন কমিশনের মূল কাজ কী? ভোটের আয়োজন করা। ভোটের আয়োজনে প্রধান পক্ষ কারা? ভোটার ও ভোটপ্রার্থী। তাহলে নির্বাচন কমিশন গঠনে যে আইন হবে সেখানে ভোটার ও ভোটপ্রার্থীর অংশগ্রহণ কোথায়?
অনেকেই বলতে পারেন, আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যাচাই-বাছাই করে সংশোধনীসহ অনুমোদন দিয়েছে। আবার জাতীয় সংসদে আলোচনা হচ্ছে। সুতরাং জনপ্রতিনিধি তো যুক্ত আছেনই এই আইন করার সঙ্গে। দুঃখিত। বিনয়ের সঙ্গে আপনাদের এই বক্তব্যটা প্রত্যাখ্যান করছি। ২০১৪ সালের বিনাভোটের ও ২০১৮ সালের রাত-দিনের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে এমপি পদ নিয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়া যায় কিন্তু সত্যিকার জনপ্রতিনিধি হওয়া যায় না।
সরকার যদি যেকোনোভাবে নির্বাচনে জেতার জন্য একটি আইন না করে ভোটারের অধিকার রক্ষায় একটি কমিশন গঠনের জন্য আইন করতে চায় তাহলে বহুপক্ষের মতামত নিতে হবে। সংসদে থাকুক বা না থাকুক, দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো, সুশীল সমাজ ও বিজ্ঞজনের সুপারিশ নিতে হবে। তার আলোকে গণশুনানি করে জনগণের মতামত নিয়ে পরে সবপক্ষের অনুমোদিত গ্রহণযোগ্য একটি আইন করতে হবে। তবেই সে কমিশন হতে পারে একটি মেরুদ-ওয়ালা প্রতিষ্ঠান।
নতুন আইন থেকে আমরা কী পাব? গত দুটি কমিশন গঠনের আগেও মহামান্য রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে নির্বাচন কমিশনে পাঁচ বছর মেয়াদি চাকরি দেওয়ার জন্য নাম চাইতেন। দলগুলো নাম দিত। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি-সহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দিতেন। আর এই আইন হওয়ার পরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে আহ্বান না করে নতুন আইন দ্বারা গঠিত সার্চ কমিটি তা করবে। এই সার্চ কমিটি রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের কাছে কমিশন গঠনের জন্য নাম আহ্বান করবেন। সেখান থেকে বাছাই করে তারা ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। সেই বাছাইকৃত ১০ জনের মধ্য থেকে একজন সিইসি ও চারজন ইসি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে নিয়োগ দেবেন তিনি। অর্থাৎ এই সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাজকে একটু সহজ করে দেবেন। বিভিন্ন দল ও পেশাজীবীদের দেওয়া তালিকাটাকে ফিল্টারিং করে ১০ জনে এনে দেবেন। ফলে গত দুই কমিশনে যে প্রক্রিয়ায় যে ধরনের ব্যক্তিদের যে উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, এই আইন হওয়ার পরে তার চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে এটা আশা করার সুযোগ নেই। বরং সরকারের উদ্দেশ্য হলো গত দুটির মতো একই পদ্ধতিতে তাদের পছন্দমতো আজ্ঞাবহ কমিশন গঠন এবং অতীতে বেআইনিভাবে করা সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত নির্বাচন কমিশনকে বৈধতা দেওয়া। তাদের এই উদ্দেশ্য ধরা পড়ে প্রস্তাবিত আইনে আগের দুটি কমিশন গঠন নিয়ে এই কথা উল্লেখ করার মধ্যদিয়ে ‘অনুসন্ধান কমিটি ও তৎকর্তৃক সম্পাদিত কার্যাবলি এবং উক্ত অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচনার এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ বৈধ ছিল বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত বিষয়ে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না’ লেখার মাধ্যমে। আসল কথা হলো, সরকার আগের দুটি কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় যে বেআইনি পথে গেছে তা যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ হতে পারে মনে করে সেটাকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দিচ্ছে।
২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতির জারি করা প্রজ্ঞাপনে যে ব্যক্তিদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল নতুন আইনেও প্রায় অভিন্ন কমিটি হচ্ছে। শুধু প্রজ্ঞাপনের সেই বিষয়টাকে আইনি কাঠামোতে আনা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত আইন পাস হলে সার্চ কমিটিতে থাকবেন ছয়জন। আইন অনুযায়ী, এ কমিটির প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। কমিটির বাকি পাঁচ সদস্য হবেন, প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত ২ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
এই তালিকাটা একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন। এর মধ্যে কি আমরা এমন কোনো সদস্য দেখতে পাই যিনি সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে সিইসি বা অন্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করতে পারেন? দুঃখজনক বিষয় হলো বাংলাদেশে সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের বেলায় দলীয়করণ করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে যে তাদের বেশিরভাগের আচরণ, কাজ ও সিদ্ধান্ত দলীয় কর্মীর চেয়েও দৃষ্টিকটু।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮১ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। যে ‘আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে’ রাষ্ট্রপতির সিইসি ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার কথা সেই আইনটিই ছিল না। তাই রাষ্ট্রপতি আইন ছাড়াই এতদিন কাজটি চালিয়েছেন। আইন করার ব্যাপারে অনেকের দাবি ও চাপের মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত যে আইনটি করতে যাচ্ছে তা এতদিন আইন ছাড়াই রাষ্ট্রপতি যে ধরনের কমিশন গঠন করতেন তা থেকে আলাদা কিছু নয়। লোক দেখানো সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি এর আগে কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ ও কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে সর্বশেষ দুটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন। এই দুটি কমিশন যে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০১৪ সালের ও ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং গত এক দশকের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো তো এই দুটি কমিশনের অধীনেই হয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা অটো নির্বাচিত হওয়া ও নির্বাচনী সহিংসতায় নিহতের রেকর্ড করেছে এই দুটি কমিশনই।
তাই আগের আদলে সার্চ কমিটি গঠন করে একই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন গঠন করে যে মানুষের ভোটের অধিকার ফিরে আসবে না সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সার্চ কমিটির যে ছয় সদস্য নির্ধারণ করা হয়েছে তাদের নিয়োগই তো বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসব পদে আজ্ঞাবহ, ক্ষমতাসীনদের নিকটাত্মীয়, দুর্নীতিবাজ ও অনুগতদের নিয়োগ দেওয়ার বহু নজির আছে। এই সরকারই তো একজন প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দিয়ে আবার তাকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে দেশছাড়া করল। অন্যপদগুলোর কথা নাই বা বললাম। ফলে যে পদের অধিকারীদের নিয়োগ ও পদে থাকা, মানইজ্জত নিয়ে দেশে থাকা বা দেশছাড়া হওয়া নির্ভর করে সরকারের নির্দেশ মতো কতটা চলতে পারল তার ওপর, তারা কী করে সরকারের পছন্দের বাইরে কাউকে তালিকায় স্থান দেবে? আর কোনো নিরপেক্ষ লোকের নাম ঢুকে গেলেও তা বাদ দেওয়ার জন্য তো মহামান্য রাষ্ট্রপতি আছেনই। কারণ আইনেই আছে, প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া রাষ্ট্রপতি এ পদে কাউকে নিয়োগ দিতে পারবেন না।
একটি গ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কমিশনও। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও বহু আকাক্সিক্ষত যে আইনটি হয়নি, তা যেন একটি পচা আইন না হতে পারে সে বিষয়ে সবারই সোচ্চার থাকতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার কারও মতামতের তোয়াক্কা না করে যদি তাদের হীন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আইনটি পাস করেই ফেলে, সেটা হবে একটি কালো আইন। কালো আইন কাউকে সাময়িক সুবিধা দিলেও আখেরে কারও জন্যই ভালো হয় না।
লেখক চিকিৎসক ও কলামনিস্ট
sayantha15@gmail.com