বারবার সেই জাফর স্যার

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বিবর্ণ সময়ে টানা ১৬৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অনশন চালিয়ে গিয়ে শাবিপ্রবির শিক্ষার্র্থীরা ইতিমধ্যেই দেশবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। দেশের অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোধসম্পন্ন সব শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মতোই দেশের মানুষও তাই শাবিপ্রবির ছাত্রছাত্রীদের জীবন বাজি রাখা আমরণ অনশনে ব্যথিত হয়েছে, তাদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে, প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। চোখের সামনে এভাবে ২৮টি তাজা প্রাণের ঝরে পড়ার শঙ্কায় নীরবে চোখের জল ফেলেছে। আর মনে মনে আর্তনাদ করেছে দেশে কি এমন কেউই নেই যে বা যারা এই অকুতোভয় সৈনিকদের মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

এমন এক নিরুপায় হতাশার গভীর অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে শাবিপ্রবিতে গিয়ে হাজির হলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই খ্যাতনামা সাবেক অধ্যাপক ও জনপ্রিয় লেখক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এবং তার স্ত্রী ও সেখানকার আরেক সাবেক অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক। শিক্ষকই শেষ পর্যন্ত ভরসা হলেন। শিক্ষকরাই ভরসা হন। জাফর ইকবাল স্যার আবারও সেই আশা জাগিয়ে তুললেন। বুধবার সকালে তারা শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে অনশন ভাঙাতে পারলেন।

প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, শাবিপ্রবির এমন অবনতিশীল পরিস্থিতিতে সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো নৈতিক সাহস কি আর কারুরই ছিল না? নানা বিশ^বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তো আন্দোলনের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, প্রতীকী অনশনে বসেছেন, মানববন্ধন করেছেন, বিবৃতি দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাড়াও দেশে আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ? অন্যদিকে অধ্যাপক জাফর ইকবালও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুরোধেই তিনি নিজের প্রিয় এই বিশ^বিদ্যালয়ে ছুটে গিয়েছেন শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন ভাঙাতে। আর সেটা তিনি করেছেন শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়া হবে সরকারের এমন আশ্বাসের ভিত্তিতেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এসব যুক্তি হাজির করে বলতে চাইছেন যে, তাহলে তার কৃতিত্ব বা মহত্ত্বটা কোথায়?

আসলে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কৃতিত্ব আর মহত্ত্ব একজন শিক্ষক হয়ে ওঠার মধ্যেই নিহিত। যে শিক্ষকের প্রতিকৃতিই আজ দেশে বড্ড বিরল হয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শাবিপ্রবিতে শিক্ষকতা শুরু করে ২০১৮ সালের অক্টোবরে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত এই বিশ^বিদ্যালয় পরিবারের একটি ভরসার নাম হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের নানা সংকটে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের নৈতিকতা বজায় রেখে সাহসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ায়, সবসময় শিক্ষার্থীদের বুকে টেনে নেওয়ার ক্ষমতায় নিজেকে সত্যিকারের এক শিক্ষকের প্রতিকৃতিতে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তিনি।

এ কারণেই সরকারের অনুরোধে শাবিপ্রবিতে গিয়েও তিনি স্বভাবসুলভ রসিকতায় বলতে পারেন, ‘দেশের ৩৪ জন ভিসি বলেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদত্যাগ করলে সবাই পদত্যাগ করবেন। আমার খুবই শখ এই জিনিসটা দেখার।... কিন্তু আমার ধারণা সেই শখ সহজে মিটবে না। এই ৩৪ ভিসির ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে।’ একই সঙ্গে প্রিয় শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা জানিয়ে শাবিপ্রবির উপাচার্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘যে মানুষ এসব দেখেও নিজের জায়গায় অনড় থাকে, তাকে আমি মানুষ বলতে চাই না, সে দানব। ওই মানুষের জন্য তোমাদের জীবন যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। তোমাদের জীবন অনেক মূল্যবান।’

বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোবাসেন বলেই এমন শিক্ষকরা বিশ^বিদ্যালয়কে কেবল সনদ বিতরণের আর নিজেদের কর্মসংস্থানের প্রকল্প হিসেবে দেখেন না। শিক্ষক নিয়োগকে ভোটার নিয়োগ হিসেবে দেখেন না। এমন শিক্ষকরা সব সময়ই বিশ^বিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক চেতনার বিষয়ে আপসহীন থাকার চেষ্টা করেন। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ১৯৯৯ সালে শাবিপ্রবির প্রথম ছাত্রী হলটির নাম শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে নামকরণের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। একইভাবে ছিলেন অধ্যাপক ইয়াসমিন হক। তখনকার আওয়ামী লীগ আমলে সিলেট এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শাবিপ্রবিকে লড়তে হয়েছিল সেই আন্দোলনে।

একইভাবে স্মরণ করা যেতে পারে ২০০২ সালে শাবিপ্রবিতে প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বর্ষবরণের আয়োজনের কথাও। জামায়াতে ইসলামী তখন বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে ক্ষমতায় ছিল। সে সময় শিবির ও ছাত্রদল কর্মীরা মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন ঠেকানোর সবরকম অপচেষ্টায়, আয়োজক শিক্ষার্থীরা যখন দিশেহারা তখনো এগিয়ে এসেছিলেন এই ‘জাফর স্যার’। লাইব্রেরির সামনের গোলচত্বর ঘিরে বিশাল স্ট্রিট পেইন্টিং করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একদল শিক্ষার্থীর করা লে-আউট নিয়ে জাফর স্যার নিজেই ভিসি-প্রক্টরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে রাজি করাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, পহেলা বৈশাখের অসাধারণ সেই বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শেষে তিনি চারুকলার শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, তিনি নিজেই তার বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাবি চারুকলার জন্য একটি ওয়েবসাইট বানিয়ে দিতে চান। বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন আদান-প্রদানের সম্পর্ক, এমন যোগাযোগই থাকা দরকার।

একইভাবে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আহ্বায়ক করেই শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মাণের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা আজও সম্ভব হয়নি। এটা নিশ্চিত যে, এসব কারণেই জনপ্রিয় এই শিক্ষককে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ক্যাম্পাসের ভেতরেই ছুরিকাঘাত করেছিল দুর্বৃত্তরা।

কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষক সবসময়ই নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মঙ্গলের প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের কল্যাণের প্রশ্নে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকেও তাই কখনো টলানো যায়নি। এ কারণেই তিনি অনশন ভাঙিয়ে শিক্ষার্থীদের বলতে পারেন ‘তোমরা যে কাজটা করেছো, নিশ্চিত থেকো, তোমাদের কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, ভিসি সিস্টেমটা ঠিক হয়ে যাবে।’

আমরাও তাই চাই। আমরা যেন ভুলে না যাই বাংলা ভাষায় তীর্থ যেমন ধর্মতীর্থ তেমনি বিদ্যাতীর্থও। যে কারণে একই সময়ে একই গুরু বা একই শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থী বোঝাতে সতীর্থ কথাটি বলা হয়। আমরা চাইব দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলো প্রকৃত অর্থেই শিক্ষার্থীদের তীর্থ হয়ে উঠুক। আর শিক্ষকরা প্রকৃতই শিক্ষার্থীদের ‘দ্বিতীয় জন্মের কারিগর’ হয়ে উঠুন।

লেখক : সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী