আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্কের মধ্যেই সংসদে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন আইন পাস হয়েছে। তড়িঘড়ি করে এ আইন পাস করায় সরকারের সমালোচনা করেছে বিএনপি। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাকশাল করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের যেমন শেষ রক্ষা হয়নি, তেমনি এখন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের আইন করেও শেষ রক্ষা হবে না।’ এ আইন নিয়ে গতকাল বামজোট আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেছেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে আর একটি মেরুদণ্ডহীন অকার্যকর ইসি গঠন মেরুদণ্ডহীন অকার্যকর ইসি গঠন হবে করা হবে।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বাকশাল-গণতন্ত্র হত্যার কালো দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল খুব দ্রুত সময়ে এ আইন করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘১৭ জানুয়ারি এ আইন মন্ত্রিসভায় পাস করা হয়েছে। ২৩ জানুয়ারি সংসদে উত্থাপন করা হয়। তারপর এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল সংসদীয় কমিটিকে, তাতে কোনো সংযোজন বা পরিবর্তন থাকলে যেন সংসদে নিয়ে আসে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টাও যায়নি। এরই মধ্যে সংসদে সেটাকে পাস করল।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ইসি গঠন আইন পাস করার কোনো এখতিয়ার এ সংসদের নেই। আমরা পরিষ্কার করে বলেছি, এই সংসদ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সংসদ নয়। সুতরাং এ আইন আমাদের কাছে নয়, সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ২৪ ঘণ্টা মিথ্যা কথা বলে। তারা যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই লুটপাট করে। এখনো লুটপাট করছে। আজকে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে অবিলম্বে তা তদন্তের দাবি জানাই আমরা। অবশ্য দীপু মনির কিছু হবে না। কারণ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।’ করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব আমিনুল হকের পরিচালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুর রহমান, সাবেক সাংসদ জহির উদ্দিন স্বপন প্রমুখ।
গতকাল ‘প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন আইন-জনপ্রত্যাশা ও করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বামজোট।
এতে বিশিষ্টজনরা বলেন, রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়া সরকার ও সরকারি দলের নীলনকশা অনুযায়ী যেভাবে সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে তা রাজনীতিতে অবিশ্বাস-অনাস্থা, বিরোধ-বিভাজন আরও বাড়িয়ে দেবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট আরও ঘনীভূত করবে। আইন প্রণয়নের নামে পুরো বিষয়টি সরকারি দলের দুর্বুদ্ধি, অভিসন্ধিমূলক ও দেশবাসীকে ধোঁকা দেওয়ার আইনি কৌশল। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সার্চ কমিটিকে আইনি পোশাক পরিয়ে রকিব ও হুদা কমিশনের মতো আর একটি অনুগত নির্বাচন কমিশন গঠন করা, যারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে সরকারি দলের পক্ষে রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে কাজ করবে। সরকারি দলকে বিজয়ী ঘোষণা করবে।
মতবিনিময় সভায় ড. শাহদীন মালিক বলেন, “সরকারের অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সার্চ কমিটি ও তাদের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন হতে যাচ্ছে। কথিত নির্বাচন আইনকে ‘সরকারি দলের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিতকরণ আইন’ বলা যেতে পারে। একইভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকেও ‘বাক্স্বাধীনতা রুদ্ধকরণ’ আইন বলা যেতে পারে। একক কর্র্তৃত্বেই এসব কথিত আইন তৈরি হচ্ছে, যা লজ্জাকর ও গ্লানিকর এবং মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সার্চ কমিটির প্রজ্ঞাপনকে এখন আইনি আবরণ দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে অনুসন্ধান কমিটির যোগ্য ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশন আইন নামে যা হচ্ছে তা নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতা; সবকিছু হবে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী।’
ব্রতীর নির্বাহী প্রধান শারমিন মোর্শেদ বলেন, ‘আইন প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াই অস্বচ্ছ। সরকারের এই তৎপরতায় জনগণের কোনো আস্থা নেই। দেখে মনে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন নামে আমরা আবার মেরুদণ্ডহীন কিছু লোক পাব।’
বামজোটের সমন্বয়ক সাইফুল হক প্রস্তাবিত আইনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে সাতটি আপত্তি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘বিল প্রণয়নের আগে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা করা হয়নি; তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। সরকারি দলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে থাকা সংসদকেও পাশ কাটিয়ে এই বিল প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সার্চ কমিটিতে সংসদে থাকা রাজনৈতিক দলেরও কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। সার্চ কমিটিতে দুজন বিচারক, দুজন সাংবিধানিক পদাধিকারী ও রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন ব্যক্তি রাখার যে বিধান যুক্ত করা হয়েছে তা পক্ষপাতদুষ্ট ও দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে নয়। কারণ বর্তমানে সাংবিধানিক পদাধিকারী ব্যক্তিরা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে নন। আর সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন প্রতিনিধিও প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেই নির্ধারিত হবেন। সার্চ কমিটির সদস্যরা যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকার ও সরকারি দলের পক্ষভুক্ত হবেন তাও পরিষ্কার।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনেই রাষ্ট্রপতিকে নতুন নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা দিতে হবে।’ এ আইন পাসের প্রতিবাদে আগামীকাল দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।
জোটের সমন্বয়ক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বামজোট নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, আবদুল্লাহ কাফি রতন, মানস নন্দি, মোশরেফা মিশু, নজরুল ইসলাম, হামিদুল হক, বাচ্চু ভূঁইয়া, বিধান দাস প্রমুখ।