‘দালাল কইছে আমার কালু বাইচ্চা আছে’: ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো ইমরানের মা

স্বপ্ন ছিল স্বপ্নের দেশ ইতালি যাবে। ভ্যানচালক বাবাকে আর কষ্ট করতে হবে না। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলো মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে। দালালের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের ঠান্ডায় প্রাণ হারায় মাদারীপুরের ৫ স্বপ্নবাজ তরুণ।

মারা যাওয়া ৫ জন তরুণের মধ্যে ছিলেন- সদর উপজেলার পশ্চিম পেয়ারপুর এলাকার ভ্যানচালক শাজাহান হাওলাদারের ছেলে মো. ইমরান হাওলাদার (কালু)। তার মারা যাওয়ার খবর জানেন না পরিবারের সদস্যরা। দালালেরা এখনো আশ্বাস দেখিয়ে যাচ্ছে তার সন্তান এখনো বেঁচে আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জানুয়ারি অবৈধভাবে সমুদ্রপথে লিবিয়া হয়ে কাঠের তৈরি অভিবাসন প্রত্যাশী ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হয় মোট ২৮৭ জন। এদের মধ্যে ২৭৩ জনই বাংলাদেশি। বাকি সবাই মিসরীয় নাগরিক। তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরে গেলে বৃষ্টি ও প্রবল ঝড়ে বাতাসে কবলে পড়ে ছয় ঘণ্টা কাটাতে হয় ঠান্ডায়। এতে মারা যায় ৭ বাংলাদেশি। ২৫ শে জানুয়ারি বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশ ইতালির দূতাবাস এবং ৭ জনের মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত করে ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাস।

আরও জানা গেছে, মারা যাওয়া ৭ বাংলাদেশি মধ্যে ৫ জনই মাদারীপুর জেলা সদরের। মারা যাওয়া মাদারীপুরের ৫ জন হলেন- সদর উপজেলার পশ্চিম পেয়ারপুর এলাকার মো. ইমরান হাওলাদার (২৩), একই ইউনিয়নের বড়াইল বাড়ি এলাকার প্রেমানন্দ তালুকদারের ছেলে জয় তালুকদার (১৮), মস্তফাপুর ইউনিয়নের চতুরপাড়া এলাকার শাহজালাল মাতুব্বরের ছেলে জহিরুল ইসলাম শুভ (২০)। এ ছাড়া রাজৈর উপজেলার ইশিবপুর ইউনিয়নের উমারখালী এলাকার সাফায়েত মোল্লা (২০) তবে সাফায়েতের পরিচয় সদর উপজেলার ঘটকচরের দেয়া আছে এ্যামবাসির পাঠানোর তালিকায়। এবং বাপ্পি পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। 

নিহত ইমরান হাওলাদারের পরিবারের সদস্যরা জানায়, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসের ২৫ তারিখ স্থানীয় দালাল সামাদ ব্যাপারীর প্রলোভনে পড়ে ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ ছাড়ে ইমরান। দুবাই হয়ে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় কাটানোর পরে লিবিয়ায় থাকা সিলেটের আহম্মেদ নামে এক দালালের মাধ্যমে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিতে ২৪ জানুয়ারি লিবিয়ার স্থানীয় সময়  রাত ৩টার দিকে অভিবাসন প্রত্যাশী ইঞ্জিন চালিত কাঠের নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের দেশ ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা করে ইমরান। কিন্তু তারপর থেকে আর কোনো কথা হয়নি ইমরানের সঙ্গে। তবে দালাল বলেছিলেন, ইমরান ইতালিতে পৌঁছাতে পেরেছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকার কারণে তিনি ওখানকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

রবিবার সকালে পশ্চিম পেয়ারপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ইমরানের বাড়িতে কেউ জানে না মৃত্যুর খবর। ইমরানের মা জামিলা বেগম বলেন, আমার কালু (ইমরান হাওলাদার) মরেনি। দালাল কইছে আমার কালু অসুস্থ তাই হাসপাতালে আছে। আপনেরা সবাই দোয়া করবেন আমার কালু যেন সুস্থ হইয়া যায়।

ইমরানের কাকা সোবহান হাওলাদার বলেন, আমাদের সঙ্গে দালালের কথা হইছে হেয় কইছে আমাগো ইমরান অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তি আছে। আপনাদের থেকে জানতে পারলাম এই নামে একজন মারা গেছে। আপনাদের কাছে আমাদের অনুরোধ আমার ভাতিজা যদি বাঁইচ্চা থাকে তাইলে সেখানে সরকার যেন ভালো একটা কাজের ব্যবস্থা কইরা দেয়। আর যদি মাইরা যায় তাহলে লাশটা যেন দেশে ফিরাইয়া আনে।

নিহত জরিরুলের বাবা শাহজালাল মাতুব্বর বলেন, দালাল আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আমাকে বলেছিল জাহাজে আমার ছেলেকে ইতালি নেবে কিন্তু একটি ফাঁকা ট্রলারে নিয়ে একপর্যায়ে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। তা ছাড়া ওই দিন আবহাওয়াও ভালো ছিল না আমার ছেলে যেতে চায়নি, তারপর পাঠিয়েছে। আমি দালালের উপযুক্ত শাস্তি চাই। আমার ছেলেকে দেশে ফেরত চাই।

এ ব্যাপারে মাদারীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, ইতালিতে প্রবেশের সময় আমাদের মাদারীপুর জেলার যে ৫ জন মারা গিয়েছে। ইতালির দূতাবাস আমার সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেছে। নিহতদের সঠিক তথ্য নিশ্চিত করে দূতাবাসকে পাঠালে এই ৫ লাশ দেশে পাঠিয়ে দেবে বলে জানিয়েছেন ইতালির কাউন্সিলের জয়েন্ট সেক্রেটারি।