এক সমতল থেকে অনন্য হয়ে গেলেন রাফায়েল নাদাল। ইতিহাস গড়লেন। মহাকাব্য লিখলেন মেলবোর্ন পার্কে। সবই করেছেন তিনি গ্রাফাইট র্যাকেট দিয়ে। ওটাই তার রং-তুলি-ক্যানভাস!
তিনি কিন্তু শিল্পী নন। তিনি টেনিসের শ্রেষ্ঠতম অ্যাথলেট। টেনিসের শিল্পী হলেন রজার ফেদেরার। তার সার্ভ, ভলি, ফোরহ্যান্ড, টপ স্পিন সব কিছুতেই মায়া লেগে থাকে। ঘাসের কোর্টের সবুজ আর উইম্বলডনের শুভ্রতার সঙ্গে তার খেলা মানায় ভালো। কিন্তু পাওয়ারের কথা উঠলেই স্প্যানিশ ম্যাটাডর ছাড়া কিছু ভাবা যায় না। তিনি ফ্ল্যামেঙ্গো মিউজিকের দেশের মানুষ। অথচ তার টেনিসে সংগীতের মূর্ছনা নেই। আছে ‘বুল ফাইটের’ উন্মাদনা। সেটা দিয়েই ২১তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতলেন। পেছনে ফেললেন ফেদেরার-জকোভিচকে।
অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে ২-৬, ৬-৭ (৫/৭), ৬-৪, ৬-৪, ৬-৪ গেমে দানিল মেদভেদেভকে হারিয়েছেন নাদাল। এই স্কোর লাইনে ৫ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের সার্ভ, ভলি, ফোরহ্যান্ড, ড্রাইড, ব্যাকহ্যান্ডের সব গল্প লেখা নেই। আছে একটা অঙ্কের হিসাব। দিন শেষে অঙ্কটাই পরে থাকে। কিন্তু তিনি নাদাল। তাই সবার চেয়ে তার অঙ্ক আলাদা। ফাইনালে নামার আগে বলেছিলেন, ‘সেরা টেনিসটা খেলতে না পারলে কোনোভাবেই একুশতম গ্র্যান্ড স্ল্যাম পাব না। এটাই একমাত্র অঙ্ক।’ অনেক জটিলতার পর অঙ্কটা মেলাতে পেরেছেন তিনি।
মেদভেদেভ সত্যি দুর্ভাগা। কেন যে তাকে নাদাল নামের এক চ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে খেলতে হলো। প্রথম দুই সেট জেতার পর তিনি অনায়াসেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপাটা হাতে নিতে পারতেন। এমনকি তৃতীয় সেটে সার্ভিস ব্রেকের পরেও ভাবনার কিছু ছিল না। চতুর্থ এবং পঞ্চম সেটেও নাদালের সার্ভিস ব্রেক করেছেন। কিন্তু শেষ হাসি নাদালই হাসলেন। কেন? একটাই উত্তর- হাসি চ্যাম্পিয়নের মুখে মানায় ভালো। তারা খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। ছাই-ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলতে পারেন।
মেদভেদেভ গত সেপ্টেম্বর যখন ফ্ল্যাশিংমেডোয় জকোভিচকে সরাসরি সেটে উড়িয়ে দেন তখন ক্র্যাচে ভর দেওয়া একটা ছবি পোস্ট করেছিলেন নাদাল। ছয় মাস আগে যার হাঁটু নিজের ভারই বইতে পারছিল না, সেই তিনি আবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন খেলবেন এবং জিতবেন এটা কে ভেবেছিল? হয়তো ৩৫ বছরের নাদাল ছাড়া কেউ নয়। ফাইটারদের স্বভাবই এমন। নাদাল বলেছেনও, ‘আমি লড়াই পছন্দ করি। হ্যাঁ, এই বয়সেও। হয়তো আমার ডিএনএ-তেই সেটা আছে। আশা করি, ফাইনালেও সেভাবেই খেলব।’ খেলেছেনও। যে খেলার অতুল ঐশ্বর্য বর্ণনা করে কার সাধ্য।
সব চ্যাম্পিয়ন নাকি তার শ্রেষ্ঠত্বের নির্যাসটুকু সেরা মুহূর্তের জন্য লুকিয়ে রাখেন। তারপর বাধা-বিঘ্ন-বিরোধ-সংক্ষোভ পেরিয়ে উন্মুক্ত করে দেন। রড লেভার অ্যারেনায় নাদালের চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট জেতার পর উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কথাটা মিলিয়ে নিন। দেখবেন নাদালকে, একমাত্র নাদালকেই সত্যিকার চ্যাম্পিয়ন মনে হবে। যার পেছনে ফেদেরার, জকোভিচ, সাম্প্রাসরা আছেন, সঙ্গে কেউ নেই। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়!