পারস্পরিক সহযোগিতা

ইসলাম সম্প্রীতির ধর্ম। এতে রয়েছে শান্তিময় জীবন গড়ার লক্ষ্যে উপদেশমূলক দিক-নির্দেশনা। বিশেষত সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি সুসংহতকরণে ইসলামের এমন চমকপ্রদ নীতিমালা রয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। এক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘ইমানদার পুরুষরা ও ইমানদার নারীরা একে অপরের সহযোগী।’ সুরা আত তওবা : ৭১

কোরআনে কারিমের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘ মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।’  সুরা হুজুরাত : ১০

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার ভাইয়ের চেহারায় তাকিয়ে মুচকি হাসাও তোমার জন্য একটি সদকা। সৎকাজের প্রতি আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বাধা প্রদানও সদকা। পথ হারানো কাউকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেওয়াটাও তোমার জন্য সদকা। দৃষ্টিশক্তি দুর্বল এমন কাউকে সহযোগিতা করাও তোমার জন্য সদকা। রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা আর হাড্ডি সরিয়ে দেওয়াও তোমার জন্য সদকা। ভাইয়ের বালতিতে তোমার বালতি থেকে একটু পানি ঢেলে দেওয়াও তোমার জন্য সদকা।’ সুনানে তিরমিজি : ১৯৫৬

একজন অপরজনকে ভাই ভাবতে পারা ও তার সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া একটি প্রশংসনীয় গুণের পরিচায়ক। এর মাধ্যমে সুসম্পর্ক তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয়ের মধ্যে আন্তরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। অন্যদের মধ্যে মানবিকতার প্রেরণা জাগায়। সেই সঙ্গে মহান রবের পক্ষ থেকে সওয়াব মেলে, যা একটি বড় উপার্জন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘নেক কাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো।’ সুরা মায়েদা : ২

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না। বরং তিনি তো তোমাদের হৃদয় ও আমল অবলোকন করেন।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৫৬৪

হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহ তার ১০০টি প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৫৬৬

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৩১৪

পৃথিবীতে মানুষ চিরস্থায়ী নয়। নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে বসবাসের পর সবাই পরপারে যাত্রা করবে। জীবনের এই ক্ষুদ্র পরিসরের ভালো কাজগুলো কেবলমাত্র গ্রহণযোগ্য। অন্যের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া একটি মহৎ কাজ। সমাজের ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র সবার কাছে এসব মানুষ মূল্যবান হয়, সবাই তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। নবী করিম (সা.)-এর ভাষায় তারা শ্রেষ্ঠ মানুষ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘উত্তম ব্যক্তি সেই, যে অন্যের কল্যাণ সাধন করে।’ সহিহ্ আল জামে

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘অন্যের কল্যাণ সাধনকারী ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ নবী করিম (সা.)-এর ওপর প্রথম অহি অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে হজরত খাদিজা (রা.) কর্র্তৃক নবীজিকে উদ্দেশ্য করে অভয় বাণী ছিল, ‘আল্লাহর শপথ! মহান প্রভু কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন। অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন। নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন। মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্য করেন।’ সহিহ্ বোখারি

নবী করিম (সা.) পৃথিবীর বুকে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনার আহ্বান নিয়ে এসেছেন। সবার মধ্যে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নবীর শিক্ষা অনন্য। সাদাকালো আর ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বিলুপ্ত করেছেন। সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন ইসলামের অনুপম শিক্ষা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, কোথায় সে দুজন যারা আমার সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল? আজ আমি তোমাদের আমার আশ্রয়ে ছায়া দান করব। এটা এমন দিন, যেদিন আমার আশ্রয় ছাড়া আর কারও আশ্রয় থাকবে না।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৫৬৬

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন মিলেমিশে থাকে। তার মধ্যে ভালো কিছু নেই, যে মিলেমিশে থাকতে পারে না। যে ব্যক্তি মানুষের বেশি উপকার করে, সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ।’ আল মুজামুল আওসাত : ৫৭৮৭

বর্তমান সমাজে পরস্পর সহযোগিতা ও কল্যাণ কামনার পরিবর্তে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সব স্তরে অন্যায় অত্যাচার ও জুলুমে ছেয়ে গেছে। একে অন্যের প্রতি অবিচার, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎসহ নানা ধরনের অনাচার, সমাজে শান্তি বিনষ্টকারী জিঘাংসা ও অন্যায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই, সে তার ভাইয়ের প্রতি অত্যাচার করে না। আবার তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় না।’ সহিহ্ বোখারি : ২৪৪২

নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা পারস্পরিক হিংসা কোরো না, পারস্পরিক শত্রুতা পোষণ কোরো না, গোয়েন্দাগিরি কোরো না, কারও দোষ তালাশ কোরো না, একে অন্যের অগ্রবর্তী হবে না, ভাই ভাই হিসেবে আল্লাহর বান্দা হও।’ সহিহ্ বোখারি : ৬০৬৪

অন্যত্র এসেছে, ‘আল্লাহ স্বীয় বান্দার সহযোগিতায় ততক্ষণ থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৬৯৯

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি সমগ্র সৃষ্টির সন্তুষ্টির চেয়েও উত্তম। তবুও আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন সমগ্র সৃষ্টিজগৎ সে বান্দার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে পছন্দ করেন তখন জিবরাইল (আ.)-কে ডেকে বলেন, আমি তাকে ভালোবাসি অতএব তুমিও তাকে ভালোবাসো। অতএব জিবরাইল (আ.)-ও তাকে ভালোবাসেন। তারপর তিনি আসমানের অধিবাসীদের ডেকে বলেন, আল্লাহ এই বান্দাকে ভালোবাসেন অতএব তোমরা সবাই তাকে ভালোবাসো। অতঃপর আসমানের সবাই সে বান্দাকে ভালোবাসে। তারপর জমিনের বুকে তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৬৩৭

ইসলামের জ্যোতি ছাড়া সর্বত্র অন্ধকার। মহান আল্লাহ নবী করিম (সা.)-এর আদর্শের মাধ্যমে সবার জন্য অনুকরণীয় শিক্ষার বার্তা দিয়েছেন। পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকার অপরূপ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। শান্তিময় সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে এ শিক্ষা অপরিহার্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন বিশেষত সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব অত্যন্ত প্রভাবশালী।