দেশের আটটি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি পাখির ওড়াউড়ি। এ ছাড়া শেয়ালের উৎপাতও আছে। আন্তর্জাতিক তিনটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো হলেও এ সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। পাখি ও শেয়াল আতঙ্ক ছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা সমস্যা আছেই। পাখি ও শেয়াল তাড়ানোর জন্য বিমানবন্দরগুলোতে মানসম্মত অস্ত্র নেই। যেগুলো আছে সেগুলো বহু বছরের পুরনো কিংবা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাশাপাশি জনবলের ঘাটতিও প্রকট।
বিমানবন্দরগুলোর আশপাশে নদী-সাগর, জলাশয়, ফসলের ক্ষেত, আবর্জনা ও জঙ্গল কিংবা কাশবন থাকায় পাখির আনাগোনাও বেশি। যশোর বিমানবন্দরে কাশবন থাকায় সেখানে শিয়াল বাস করে। মাঝেমধ্যে এরা রানওয়েতে চলে আসে। পাখির ধাক্কার কারণে বা ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে যাওয়ায় উড়োজাহাজ ওঠা-নামায় বিঘ্ন ঘটে ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত কয়েক বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৭ বছরের পুরনো চারটি এয়ারগান দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। পাখি তাড়ানোর (বার্ড শুটার) কাজে নিযুক্ত আছেন ৯ জন। কিন্তু মাঝেমধ্যে অস্ত্রগুলো ব্যবহারও হয় না। কয়েক বছর আগে ‘বার্ড মনিটরিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম’ কেনার কথা বলা হলেও কেনা হয়নি।
জরুরি ভিত্তিতে শতাধিক এয়ারগান কেনা ও লোকবল নিয়োগ দিতে গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বেবিচকের একটি সূত্র জানিয়েছে। বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চিঠিতে বলা হয়েছে যে দেশের সব বিমানবন্দরে বিমান ওঠা-নামার সময় পাখির আঘাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। উড়োজাহাজ ওঠা-নামার সময় শিয়াল ও পাখির আতঙ্কে থাকেন পাইলটরা। বার্ড শুটারদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।
জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করা হচ্ছে। পাখি ও শিয়াল তাড়াতে উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্র কেনার চেষ্টা চলছে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাখি ও শিয়াল মারার মানসম্মত অস্ত্র নেই। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোরও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
দুটি এয়ারলাইনসের কয়েকজন পাইলট দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে দিনে পাখি ও রাতে শিয়ালের উৎপাতের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে শাহজালালসহ তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থা বেশি খারাপ। বিমান উড্ডয়ন বা অবতরণের সময় পাখির উৎপাত থাকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি প্রশিক্ষিত বার্ড শুটার ইউনিট। ভারতসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে বার্ড শুটার ইউনিট রয়েছে। তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে।
তারা আরও জানান, প্রতিদিন শাহজালালে ১৪০টির মতো দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানের উড়োজাহাজ ওঠা-নামা করে। শাহআমানতে ওঠা-নামা করে অন্তত ৭০টি।
বেবিচক সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর কক্সবাজার (আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার কাজ চলছে), বরিশাল, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও যশোরে নেই অস্ত্র।
২০২০ সালে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে বার্ড শুটার নেই। একটি বন্দুক ছিল সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে অন্তত ২০টি উড়োজাহাজে পাখির ধাক্কার ঘটনা ঘটে। জরুরি অবতরণ করতে পারায় ২১০ আরোহীর জীবন রক্ষা পায়। ওই বছর বিমানের আরেকটি উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ার পর পাইলট নিশ্চিত হন পাখায় একটি পাখি আটকে আছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে আকাশে চক্কর দেয় বিমানটি। পরে বাধ্য হয়ে শাহজালালে জরুরি অবতরণ করে। ২০২০ সালেও এমন ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দরেও ২০১৯ সালে একটি বেসরকারি বিমান কোম্পানির একটি উড়োজাহাজ পাখির আঘাতের শিকার হয়। এর আগে ২০১৫ সালে সিলেটে ওসমানী বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। রানওয়েতে অবতরণের সময় বার্ড শুটার ছিলেন না।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে গত দশ বছরে পাখির আঘাতের শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। পাখি বা শিয়ালকে প্রতিরোধ করতে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) নানা গাইডলাইন দেয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। যেমন অস্ত্র চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠালেও কোনো সাড়া মিলছে না। তিনি আরও বলেন, শাহজালালে বছর পাঁচেক আগে পাখি তাড়াতে সাইরেনের ব্যবস্থা ছিল বিমানবন্দরে। নানা কারণে তাও বন্ধ হয়ে আছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মাসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় একটি সার্কুলার জারি করেছে পাখি মারার অস্ত্র এয়ারগান ব্যবহার না করতে। বিষয়টি নিয়ে তারা ওই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। কারণ বিশে্বর সব বিমানবন্দরেই পাখি মারা বা তাড়ানোর জন্য এয়ারগান ব্যবহার করা হয়। পাখি বা শিয়ালের অবাধ বিচরণ বন্ধ করতে এয়ারগান ব্যবহারের বিকল্প নেই। তিনি আশা করেন দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান করা হবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশে^র বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাখি তাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী নিয়ে আলাদা বিভাগ থাকে। কিন্তু আমাদের বিমানবন্দরগুলোতে পাখি বা শিয়াল তাড়ানোর অস্ত্র নেই। আমরা বেবিচককে বলে আসছি শাহজালালসহ সবকটি বিমানবন্দরে শক্তিশালী বার্ড ইউনিট গড়ে তুলতে। আশা করি তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ করবে ও অস্ত্র কিনবে।’