ডায়াবেটিস রোগীর রক্ত পরীক্ষা

বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮৪ লাখ ডায়াবেটিস রোগী আছে। ২০৪৫ সাল নাগাদ দেশের দেড় কোটি মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এক নীরব ঘাতক। এটি নীরবে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। ডায়াবেটিসের কারণে অন্ধত্ব, কিডনি জটিলতা, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, নিউরোপ্যাথি, অকালপঙ্গুত্বসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে সচেতন নয়। দেশের মাত্র ১২ ভাগ মানুষের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা সাধারণত রক্তে গ্লুকোজ পরিমাপের মাধ্যমে জানা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা অজ্ঞতাপ্রসূত বা সচেতনতার অভাবে ভুল নিয়মে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে থাকেন। ফলে রোগীর ব্লাড গ্লুকোজের সঠিক মাত্রা তথা ডায়াবেটিসের অবস্থা সঠিকভাবে জানা যায় না। চিকিৎসকরা সাধারণত ব্লাড গ্লুকোজের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা নির্ধারণ করে থাকেন। ভুল ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দিলে তা রোগীর জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। তাই প্রত্যেকটি রোগীর রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করার সঠিক পদ্ধতি জানতে হবে।

ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ পরীক্ষা (ঋইঝ): এই পরীক্ষা খালি পেটে করতে হয়। রাতে খাবারের পর ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা কোনো খাদ্যদ্রব্য বা পানীয় (পানি ছাড়া) না খেয়ে এই পরীক্ষা করাতে হবে। অনেকেই এই পরীক্ষার আগে সকালের নির্ধারিত ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন নিয়ে পরীক্ষা করেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। তবে রাতে যদি কোনো ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণের নির্দেশনা থাকে, তাহলে রোগীকে অবশ্যই আগের দিন তা নির্ধারিত সময়েই নিতে হবে।

নাশতার ২ ঘণ্টা পর ব্লাড গ্লুকোজ পরীক্ষা (অইঋ) : সকালের নাশতা খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর এই পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর আগে সকালের নির্ধারিত ওষুধ বা ইনসুলিন (যদি থেকে থাকে) নিয়ে নির্ধারিত সময় পরে নাশতা করুন। নাশতার পরে যদি কোনো ওষুধ থেকে থাকে, তা নির্ধারিত মাত্রায় সেবন করুন। নাশতার দুই ঘণ্টা পরে আবার রক্ত দিন। তবে অনেকে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক আসবে, এমন খাবার বেছে নিয়ে খান বা কম পরিমাণে খান। কেউ কেউ আবার পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেলেন। এগুলোর কোনোটাই সঠিক নয়। আপনার চিকিৎসক বা ডায়েটেশিয়ান কর্র্তৃক নির্ধারিত খাবার গ্রহণ করেই পরীক্ষা করতে হবে। তাতে সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া যেকোনো প্রধান খাবার (যেমন: লাঞ্চ বা ডিনারের) আগে বা ২ ঘণ্টা পরে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা যায়। সেই ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

র‌্যান্ডম ব্লাড সুগার পরীক্ষা (জইঝ)   : এই পরীক্ষায় রক্তের নমুনা যেকোনো সময় দেওয়া যায়। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত মাত্রার ওষুধ বা ইনসুলিন অবশ্যই নিতে হবে।

এ ওয়ান সি পরীক্ষা (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন) : এই পরীক্ষা খালি পেট বা খাবারের পর, যেকোনো সময়ই রক্তের নমুনা দেওয়া যায়। এর মাধ্যমে বিগত তিন মাসে রক্তে শর্করার গড়মাত্রা জানা যায়। এই পরীক্ষা এখন সারা বিশ্বে বহুল প্রচলিত।

ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। এই রোগ নিয়ে তাই সচেতন হতে হবে সবাইকে। সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ডায়াবেটিস নিয়েও সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন সম্ভব।