বিদ্যুৎ বিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ক্রীড়াঙ্গন

ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্তারা হঠাৎই যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন! ২৫ জানুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) এক চিঠিতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে তাদের। চিঠি নয়, সেটি আসলে এনএসসির বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া পরিশোধের তাগাদাপত্র। ৫১টি ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনকে চিঠি দিয়ে এনএসসি বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া বাবদ ৩ কোটি ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৬ টাকার কথা জানিয়েছে। পরিশোধে বেঁধে দেওয়া ১৫ দিন সময় শেষ হচ্ছে আগামীকাল। বিল পরিশোধের অভ্যাসই যেখানে নেই, সেখানে এত টাকা কোথা থেকে দেবে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছে না ফেডারেশন কর্তারা। বকেয়া পরিশোধ না করারও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

যদিও এই বকেয়া নিয়ে আছে রহস্য। ঠিক কবে থেকে বিল বকেয়া, সেটা জানা নেই খোদ এনএসসিরও। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়ার একটা তালিকা করেছে তারা। এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে একই স্থাপনা ব্যবহার করা টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের বকেয়ার অঙ্ক সমান। এনএসসি জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে নিয়মিতই এই বিল পরিশোধ করে আসছে তারা। বাস্তবতা হলো, কোনো ফেডারেশনই এই দায় বহন করেনি কখনো।

তালিকায় দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি ৬৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮৭ টাকা বকেয়া হকি ফেডারেশনের। এর পরেই আছে ক্রিকেট বোর্ড (৩৯ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা)। তৃতীয় স্থানে ভলিবল ফেডারেশন (২৯ লাখ ৮১ হাজার ৭১৯ টাকা)। ফুটবল ফেডারেশন ও তাদের আওতাধীন মহানগর ফুটবল লিগ কমিটির বকেয়া ২৮ লাখ ৯ হাজার ৫৯২ টাকা। বাকি ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোরও কমবেশি বকেয়া আছে। এনএসসির তাগাদাপত্রে স্বাক্ষর করা পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহানের ব্যাখ্যা, ‘আমরা কিন্তু নিয়মিত বিল পরিশোধ করে যাচ্ছি। সেই বকেয়াগুলো তো আদায় করতে হবে। কতদিন এই ভার বয়ে যাবে এনএসসি? তাই চিঠি দেওয়া হয়েছে। দেখা যাক ফেডারেশনগুলোর কাছ থেকে কী ধরনের সাড়া পাওয়া যায়। অনেক ধনী ফেডারেশন আছে। তাদের মধ্যেও বিল দেওয়ার প্রবণতা নেই।’

এনএসসি’র সচিব পরিমল সিংহ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বিদ্যুতের মূল পয়েন্ট। প্রত্যেকটা ফেডারেশনের জন্য সাব-মিটার করা আছে। ব্যবহার অনুযায়ী তাদের বিলের টাকা আমাদের কাছে পরিশোধ করার কথা। অথচ প্রায় ৯০ শতাংশ ফেডারেশনের বকেয়া রয়েছে। আগের চেয়ারম্যানের সময় একটা সিদ্ধান্ত ছিল, যারা বকেয়া রেখেছে, তাদের বার্ষিক বরাদ্দ থেকে ভাগে ভাগে কেটে রাখার। যদিও বরাদ্দ বড্ড সামান্য। আমরাও কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করিনি। সেটা করার সিদ্ধান্তও নেই। অল্প অল্প করে দিলেও একটা ধারাবাহিকতা থাকে।’

সোমবার এ নিয়ে সভায় বসেছিলেন ফেডারেশন কর্তারা। ক্রীড়া ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকদের সংগঠনের সভাপতি ও হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনুর বলেন, ‘ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো অনেক কষ্ট করে বছরব্যাপী খেলাধুলা পরিচালনা করে। তাদের স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস নেই। স্পন্সরদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে চলতে হয়। ক্রীড়া পরিষদ বার্ষিক যে বরাদ্দ দেয় তা দিয়ে স্টাফ বেতনও হয় না। এ অবস্থায় বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার অবস্থা আমাদের নেই। আমরাই সারাবছর খেলা মাঠে রাখি। আর এনএসসি গঠনই করা হয়েছে আমাদের ভালোমন্দ দেখভালের জন্য। এ অবস্থায় আমরা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ হকি ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘দেখুন, আমরা অনেক কষ্ট করে খেলা চালাই। স্পন্সরের টাকা এনে যদি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করি, তাহলে আর কোনো স্পন্সর আমরা পাব না। হকি স্টেডিয়ামের নিচে অনেক দোকান আছে। এসব থেকে রাজস্ব কিন্তু এনএসসি নিয়ে যাচ্ছে। এখন তারা যদি দোকানগুলো ক্রীড়া ফেডারেশনের কাছে বরাদ্দ দিত আমাদের একটা স্থায়ী আয়ের উৎস হতো। ক্রীড়াবান্ধব সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় বিষয়টি দেখবেন।’ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ কখনই বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হয় না জানিয়ে বলেন, ‘বছরে আমরা এনএসসি’র কাছ থেকে বরাদ্দ পাই চার কিস্তিতে ২০ লাখ টাকা। আমরা কখনই বিদ্যুৎ বিল দেই না। এখন যদি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা অন্যায় হবে।’ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রকিব মন্টু জানান, ‘সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই বকেয়া আমরা দেব না। সরকারের কাছে অনুরোধ করব এ বিষয়ে একটা স্থায়ী সমাধান করার।’