মুক্তিযুদ্ধ ও একজন সুভাষ দত্ত

মহান মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক, বিশিষ্ট অভিনেতা, চলচ্চিত্রকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্ত (৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০-১৬ নভেম্বর ২০১২) ছিলেন একজন সৃজনশীল সত্তা, কুশলী কৃতবিদ, সৎ ও স্বচ্ছমনের অধিকারী। প্রায় এক যুগ আগে নিজের সহযাত্রী আত্মীয়ের সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু দেখে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তার উপলব্ধির স্তরে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে, পরে তিনি সর্ববাদী, সাত্ত্বিক সাধনায় নিবেদিত হন। তার ‘আলিঙ্গন’ ছবিতে এ ধরনের একটি চরিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছিল আমাদের। তার মধ্যে আমরা এমন একটি চরিত্রের সন্ধান পাই যার কাছে সব ধর্ম ও মতের মধ্যে ঐকমত্যের মর্মবাণী অনুভূত হয়। রামকৃষ্ণ মিশনের অনুরক্ত অনুসারী, বেলুড়মঠের নরেন্দ্রপুরের আত্মিক সাধনার সাত্তিক পুরুষ সুভাষ দত্ত ‘মনরে চল নিজের নিকেতনে’ স্বামী বিবেকানন্দের এই ভূয়োদর্শনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। সব ধরনের সংকীর্ণতা রহিত সুভাষ দত্ত সর্ববাদী মতাদর্শের ছিলেন। তিনি অকপটে লিখেছেন, ‘আমি ধর্মান্ধ নই, আমার ভেতর কোনো সংকীর্ণতা নেই। আমি আজমির শরিফে গিয়েছি বেশ কয়েকবার। শাহজালাল, শাহ পরাণ, শাহ মোস্তান, হাইকোর্টের মাজার, মিরপুরের মাজার এসব জায়গায় আমি গিয়েছি। টুপি পরে বা মাথায় পাগড়ি দিয়ে ধ্যান করেছি, মোনাজাত করেছি। আমি মিলাদ মাহফিলে শরিক হয়েছি। চার্চে নতজানু হয়ে যিশুর সামনে প্রার্থনা করেছি, গেছি বৌদ্ধবিহারে।’

অনন্য সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী সুভাষ দত্তের শিল্পভাবনার শর্ত ও মূল্যবোধ ছিল জীবন-সংগ্রামে মুখর তুখোড় তৎপরতা শেষে শিকড়ের কাছে প্রত্যাবর্তন, নিজের উপলব্ধির কাছে ফিরে আসা। পৈতৃক নিবাস বগুড়ার সারিয়াকান্দি ধুনটের হাটশের গ্রামে আর লেখাপড়ার হাতেখড়ি দিনাজপুরে মাতুলালয়ে, বড় হয়েছেন সেখানে। নিজে পড়াশোনার পাঠ মাঝপথে চুকিয়ে ‘ফিল্মের টানে’ সুদূর বোম্বেতে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেখানে ‘অনেক কিছু’ করার পর দেশে, সেই দিনাজপুরেই ফিরেছিলেন। ‘জীবিকার শহর ঢাকা’য় তার পদার্পণ ১৯৫৩ সালের ২৩ নভেম্বর।

ঢাকায় সিনেমার প্রচারপত্র ও আর্ট ডিরেকশন এবং বাংলা-উর্দু ছবিতে কৌতুকপ্রদ চরিত্রে অভিনয় করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন। অসম্ভব অনুসন্ধিৎসু এবং সূক্ষ্ম দৃষ্টির অধিকারী কঠোর পরিশ্রমী এই মানুষটির সব সময় আগ্রহ ছিল সৃজনশীল কিছু করার। জীবনকে যেমন দেখতেন তীক্ষè দৃষ্টিতে, তেমনি এর শিল্পিত রূপায়ণেও ভাবতেন বেশি। আর এর জন্য তার পড়াশোনা ও অধ্যবসায় শেষমেশ মেশে সেলুলয়েডের ফিতার ক্যানভাসে জীবনের নিত্যতাকে তুলে ধরার। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণশৈলীর অনুরক্ত ভক্ত বনে যান। নিজে চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্প যখন পশ্চিম বাংলার সেরা সব বাংলা ছবি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ছবির প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় নিরুদ্দেশ যাত্রী, এই ঢাকাতেও উর্দু ছবি নির্মাণের বন্যা বইতে শুরু করেছিল, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে রক্ত দিতে হচ্ছিল, স্বাধিকার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অয়োময় আকাক্সক্ষা যখন দানা বাঁধছিল, সে সময় ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্ত ‘সুতরাং’ ছবি নির্মাণ করে বাঙালির, বাংলা সংস্কৃতির, সৃজনশীলতার, মৌলিকত্বের মর্মমূলে যেন আত্মবিশ্বাসের বিজয় নিশান উড়িয়ে দিলেন। সুতরাং সবাই নতুন-চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, সংগীত পরিচালক, গীতিকার, নায়িকা, নায়ক, প্রযোজক এরা সবাই যেন এক কাতারে শামিল হলেন নতুন পথের, প্রত্যয়দীপ্ত নবযাত্রার অভিষেক ঘটাতে। সুভাষ দত্ত ‘সুতরাং’ করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প নেন ১৯৬২ সালের শেষের দিকে। পত্রিকায় সুতরাং বানানোর বিজ্ঞাপন দেখে বাংলাবাজারের মেসে বসবাসকারী জনৈক সত্যসাহা (১৯৩৪-১৯৯৯) সত্যই সাহস করে এসে সুরকার হতে চাইলেন। ‘আমি সত্যসাহার দু-একটা পরীক্ষা নিলাম। কেমন সুর-টুর জানে। তারপর ছবির সিচুয়েশন নিয়ে বসলাম। বললাম, এ ধরনের গান লাগবে আমার ছবিতে। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। এটা হওয়ার পরে আমি নায়িকা খুঁজব। যেহেতু আমি বেঁটে মানুষ। তাই ছোটখাটো একটা মেয়ে দরকার আমার বিপরীতে, নায়িকা হওয়ার জন্য।’

তার নায়িকা আবিষ্কারের কাহিনীটিও অভিনব। ‘আমি ছবির ষোলোটি দৃশ্যের স্কেচ এঁকে পাঠালাম। স্কেচ দেখে মীনার ছবি তুলে আনলেন সত্যসাহা। কয়েকটি ফটোগ্রাফ খুবই ভালো লাগল। বললাম, ঠিক আছে। ওকে আসতে বলো। তারপর মীনা তার বাপ এবং বোনদের নিয়ে ঢাকা এলো। এখন আমার দুই প্রোডিউসার ওকে দেখে হইচই করে উঠলেন। আরে, এ দেখছি খুবই ছোট মেয়ে। বাচ্চা মেয়ে। একে দিয়ে হবে নাকি। মীনা পাল ফ্রক পরা ছিল। আমি বললাম, ফ্রকটা ছেড়ে শাড়ি পরে এসো। ওরা নবাবপুরে ঢাকা বোর্ডিংয়ে উঠেছিল। সে হোটেলে গিয়ে শাড়ি পরে এলো। দেখলাম ভালোই লাগছে। মুহূর্তে শুয়োপোকা থেকে প্রজাপতির মতো মীনা পাল থেকে কবরী বেরিয়ে আসে। ওর চেহারার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ওর হাসি।’

‘রাশোমোন’ (১৯৫০) যেমন জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরো সাওয়া (১৯১০-১৯৯৮), ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫) যেমন সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২), অমরত্বের স্বপ্ন জাগানিয়া ছবি সুতরাং (১৯৬৪) তেমনি সুভাষ দত্তের। এ ছবিতেই প্রথম এ দেশের চলচ্চিত্রে স্বপ্নদৃশ্য দেখা যায়। ছবির শেষে নায়ক-নায়িকার মিলন হয় না। বিয়োগান্ত পরিণতিও এ দেশীয় চলচ্চিত্রে প্রথম। ফ্রাঙ্কফুর্ট এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবে সুতরাং দ্বিতীয় পুরস্কারে বিজয়ী হয়েছিল। বলেছেনও সুভাষ দত্ত ‘পুরস্কার-টুরস্কার নয়, সুতরাং আমার বড় আদরের সন্তান। বিপুল এক শিল্পনেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল ছবিটি নির্মাণের সময়। আমি নিঃসংকোচে শ্রম ও সাধ্য ঢেলেছি এতে। আমি মরণশীল সামান্য মানুষ। শিল্প মানুষকে অমরত্ব দেয়। আমি উচ্চাভিলাষী নই, তবে এটুকু বলতে পারি, আন্তরিক সৃষ্টি হিসেবে সুতরাং বেঁচে থাকবে।’

তৎকালীন বাঙালি সমাজের প্রতিচ্ছবি এতে দৃশ্যমান হয়েছে। এ দেশের চলচ্চিত্রের মাইলফলক এই চলচ্চিত্রটি শুধু-সুভাষ দত্ত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বহির্বিশ্বে এ-দেশকে পরিচিত করেছে। এই ছবিটি প্রথম বাংলা ছবি হিসেবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্রের অনেকগুলো কাজের সূত্রপাত ঘটেছিল ‘সুতরাং’-এর মাধ্যমে। এ-দেশের চলচ্চিত্রে প্রথম রিমিক্স প্রথা চালু হয় ‘সুতরাং’-এ। ভাই-বোনকে দিয়ে প্রথম ডুয়েট গানের প্রচলন, সর্বপ্রথম স্বপ্নদৃশ্যের অবতারণা এবং এ দেশে প্রথম বিয়োগান্ত ছবিও এটি। ২৩ এপ্রিল ১৯৬৪ সালে ছবিটি মুক্তি লাভ করেছিল। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নির্মিত চলচ্চিত্রের সর্বাধিক আয় করেছিল ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্র। এ ছবির নির্মাণব্যয় হয়েছিল এক লাখ টাকা। আয় হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা।

সুভাষ দত্তের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর মর্মবাণী হলো শিকড়ের কাছে ফিরে আসা। ‘সুতরাং’ ছবিতে তার নিজের অভিনীত চরিত্র সিপাহি জব্বার শহরে ব্যস্ত সমস্ত কর্মজীবন ছেড়ে ‘ওরে মন ছুটে চল মধুমতী গায়’ গাইতে গাইতে ফিরেছে গ্রামে। ‘কত ঘুরে এলাম কত দেখে এলাম অশান্ত মনে আমি ছুটে এলাম...আমার গায়ের মতো কভু দেখিনি, সে যে আমার জন্মভূমি...’ ‘আলিঙ্গন’র সাধু বাবার মতো সুভাষ দত্ত তার শিল্পকর্মে, ‘বসুন্ধরা’য় সেই মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি প্রকাশ করেছেন। দেশিকোত্তম এই ব্যক্তিত্ব নিজের দেশ, মাটি ও মানুষকে সর্বোচ্চ মহিমায় দেখিয়েছেন।

১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েও সেই অভিনয় সুনামের সুবাদে পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেনের শ্রদ্ধা ও সমীহবোধের কারণে মুক্তি পেয়েছিলেন। নিজের সেই মুক্ত পাওয়ার স্মৃতিকে ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’-তে আনোয়ার হোসেনের অভিনয় জীবনের মধ্যে তুলে ধরেছেন। ‘সুতরাং’ ছবিতে নিজের প্রেমিকা জরিনার মাতৃহারা সন্তানকে যেমন লালনপালনের দায়িত্ব নেওয়ার ঔদার্য মেনে দেখিয়েছেন, তেমনি ১৯৭২ সালে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বীরাঙ্গনাদের সামাজিক পুনর্বাসনে রেখেছেন মানবীয় দর্শনের ব্যাখ্যা ও সমাধানের প্রেরণা। অধ্যাপক আশরাফ সিদ্দিকীর ‘গলির ধারের ছেলেটি’র চলচ্চিত্রায়ণে (ডুমুরের ফুল) একই সঙ্গে শিশু মনস্তত্ত্বের ও মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গির এমন কাব্যিক শোকগাথা নির্মাণ করেন, যা একটি ধ্রুপদী শিল্পকর্মে উন্নীত হয়। ‘আবির্ভাব’ ও ‘বসুন্ধরা’ ছবিতে সন্তানময়ী মায়ের আবেগ ও আকিঞ্চন আকাক্সক্ষাকে শৈল্পিক তুলিতে বিমূর্ত করেছেন। তার তাবৎ চলচ্চিত্রেই মানবিক মূল্যবোধের, সমাজ দর্শনের এবং নিবিষ্ট চিন্তা-চেতনার ভাষ্যে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।

খুব কাছে থেকে দেখার এবং তার কিছু কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুবাদে এ কথা বলতে পারি, সুভাষ দত্ত একজন মহৎপ্রাণ শিল্পী ছিলেন। চলচ্চিত্রকে শিল্পমর্যাদায় অভিষিক্ত করতে তার প্রয়াসের যেমন অন্ত ছিল না, আবার তার হাতেই বাংলা চলচ্চিত্রে পুঁজি বিনিয়োগের সার্থকতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বলা বাহুল্য, তিনিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নাবালকত্ব থেকে সাবালকত্বে, উর্দু ছবির ভববন্ধন থেকে বাংলা ছবিকে রক্ত-মাংসসহ সবল-সতেজ ও শিল্প বিনিয়োগ উপযোগী করে তোলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুরো ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ ছিলেন তিনি।

তবে বড় বেদনার বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং সে অভিজ্ঞতাকে বাঙ্ময় করে তুলতে ‘অরুণোদয়ে অগ্নিসাক্ষী’র মতো মুক্তিযুদ্ধের দলিলের স্রষ্টা সুভাষ দত্ত তার জীবদ্দশায় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর মৃত্যুবরণের পর তার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলে, শব্দসৈনিক হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর, ২০১৩ সালে। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি অর্জন কিংবা রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্তির চিন্তা কখনোই মাথায় নেননি এই অমর চলচ্চিত্রকার ও প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সংস্কৃতিসেবী সুভাষ দত্ত।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান