তিন দিন পূর্বে যে গ্রামটিতে ছিল মানুষের কোলাহল; চাস্টল, হাট-বাজরে নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের বিশ্লেষণ। সেই গ্রামটি এখন জনমানব শূন্য বিরান ভূমি। এমনকি জুম্মার নামাজে মুসল্লিদের উপস্থিতিও ছিল খুবই কম; কোনো কোনো মসজিদে এক কাতারও পূর্ণ হয়নি।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, পুলিশি তাণ্ডবের ভয়ে গ্রামছাড়া হয়েছে নারী-পুরুষেরা। গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে পুলিশ ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালিয়েছে। অবশ্য, পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের ছোট শালঘর গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশি আতঙ্ক এড়িয়ে কিছু নারী-পুরুষ এবং শিশুরা নিজেদের বাড়ি পাহারায় আছেন। যারা আছেন, তাদের চোখে-মুখেও উৎকণ্ঠা। গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই পরিবারের একটি বিয়ের আয়োজন থাকলেও গ্রামবাসীর তেমন কাউকে দেখা যায়নি। বরযাত্রীর সঙ্গে যারা এসেছেন তাদের ভয়ে ভয়ে থাকতে দেখা গেছে।
ছোটশালঘর গ্রামের মৈশান বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সুবেদার আবু তাহের জানান, ‘ঘটনার সূত্রপাত ভোটের দুদিন আগে বিজয়ী মেম্বার আলম হাজারীর সমর্থক অটোরিকশা চালক জিকির আলীর সঙ্গে ফরিদ মেম্বারের সমর্থক মোশাররফ হোসেন সরকারের তর্ক ও হাতাহাতি নিয়ে। পরে এই তর্কাতর্কির জেরে দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ফরিদ মেম্বারের বাড়িতে হামলা হয়। হামলায় ফরিদ মেম্বারের সমর্থক আবিদ হোসেন সরকার, শাহজাহান সরকার ও মোশাররফ হোসেন সরকারের দ্বিতল ভবনে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।’
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলম হাজারী ও তার বড় ভাই শাহজাহান হাজারীকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ওই সংবাদে আলম হাজারীর কয়েকশত সমর্থক হাজারীর মুক্তির দাবিতে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা, ফাঁকাগুলি, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এতে নারীসহ ২৫-২৬ জন বুলেট বিদ্ধ হন।
অপর দিকে আলম হাজারীর সমর্থকদের ইট-পাটকেলে একজন এসআইসহ ৪ পুলিশ আহত হন।
ওই ঘটনার পর কুমিল্লা পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৬০ জন রিজার্ভসহ পাশের চার থানার শতাধিক পুলিশ নিয়ে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। শুক্রবার পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে। ফলে, পুলিশের ভয়ে ওই গ্রামটি নারী-পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে।
গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি-ঘরের দরজা ও প্রধান ফটকে তালা দেয়া। কিছু কিছু বাড়ির ঘরের দরজা খোলা থাকলেও ঘরের ভেতরে সুকেস, আলমারি, চেয়ার-টেবিল, দরজা, জানালা, রান্না ঘরের চুলা ভাঙচুর অবস্থায় পড়ে আছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই তাণ্ডব চালিয়েছে পুলিশ।
আটক আলম হাজারীর স্ত্রী অঞ্জনা আক্তার ও তার ননদ ফরিদা আক্তার জানান, ‘গত বুধবার সকালে ছোটশালঘর গ্রামে আলম হাজারীর লোকজন বিজয় মিছিলের প্রস্তুতি নেন, পরে পুলিশের বাধায় বিজয় মিছিল বন্ধ করা হয়। একই সময়ে শুনতে পাই ফরিদ মেম্বারের সমর্থকেরা আলম হাজারীর সমর্থক জিকিরকে মারধর করছে, ওই সংবাদ পেয়ে আলম হাজারীসহ তার কিছু সমর্থক ঘটনাস্থলে পৌঁছান।’
তারা আরও জানান, ‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ আলম হাজারী ও তার ভাই শাহজাহান হাজারীকে মীমাংসার কথা বলে ডেকে নিয়ে লাঠি পেটা শুরু করে; একপর্যায়ে তারা অচেতন হয়ে পড়লে তাদের গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর আলম হাজারীর সমর্থকেরা আটকদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে।’
এলাকার হাজেরা খাতুন নামে একজন জানান, ‘ঘটনার দিন এলাকায় ৩-৪টি ঘর ও ২টি দোকান ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ পুরো গ্রামটি ঘিরে ফেলে। তল্লাশি চালানোর নামে তারা ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে, দরজা-বেড়া-জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে।’
একই বর্ণনা দেন সানি মোহাম্মদ বাড়ির সাহিনা আক্তার। তিনি জানান, ‘পুলিশ তাদের বাড়ির ৬ নারীকে টানাহেঁচড়া করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। তারা প্রতিটি ঘরের রান্নার চুলা-আসবাব ভাঙচুর করে ঘরের লেপতোষকে পানি ঢেলে ভিজিয়ে দেয়। এমন কোনো ঘর নেই যেখানে পুলিশের তাণ্ডবের চিহ্ন নেই।’
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আরিফুর রহমান জানান, ‘নজিরবিহীন নিরাপত্তা এবং কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। অথচ নির্বাচনের দুদিন পরই পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে শুরু করে। আলম হাজারী তার বাহিনী দিয়ে ফরিদ মেম্বারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট চালায়। তারা দা, ছেনি, লাঠি, রডসহ বিভিন্ন দেশীয় অন্ত্র নিয়ে সড়ক অবরোধ করে গাড়ি ভাঙচুর ও জনগণের ভোগান্তি তৈরি করে। আমরা অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে প্রাণহানি ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি।’
তিনি আরও জানান, ‘ঘটনার পর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন ও সাঁড়াশি অভিযানসহ ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনা করি। পুলিশকে বিতর্কিত করতে আলম হাজারীর সেকেন্ড ইন কমান্ড সুজন হালদার, শাহীন, নাজমুল রিফাতসহ প্রায় সহস্রাধিক কর্মী সমর্থক এলাকায় নিজেদের বাড়িঘর-দরজা-ভাঙচুর করেছে। এর দায় এখন তারা পুলিশের ওপর চাপাচ্ছে।’