প্রতিবেশী মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইসলামে প্রতিবেশীর হককে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজকাল এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে চরম অবহেলা দেখা যায়। বছরের পর বছর পার হয়ে যায় পাশের বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাটের কারও সঙ্গে কথা হয় না, খোঁজ-খবর নেওয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের ডানে-বামে, সামনে-পেছনে চল্লিশ বাড়ি পর্যন্ত প্রতিবেশীর আওতার অন্তর্ভুক্ত।’ সহিহ্ বোখারি
মৌলিকভাবে যিনি আমার পাশে থাকেন, তারাই প্রতিবেশী। তাই বাড়ির সঙ্গে তার বাড়ি হোক কিংবা দেশের সঙ্গে তার দেশ হোক। মুসলিম হোক, অমুসলিম হোক, নারী হোক কিংবা পুরুষ সবাই প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবেশী সাধারণত তিন শ্রেণির হয় ১. অনাত্মীয় বিধর্মী প্রতিবেশী। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী হওয়ার ভিত্তিতে। ২. মুসলিম প্রতিবেশী, যার সঙ্গে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী ও মুসলিম হওয়ার দিক থেকে। ৩. মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী, মুসলিম ও আত্মীয় হওয়ার দিক থেকে।
তবে প্রত্যেক শ্রেণিই যেহেতু প্রতিবেশী, তাই প্রতিবেশীর সব হকের ক্ষেত্রে সবাই সমান হকদার। আর প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখা, বিপদাপদে এগিয়ে যাওয়া, একে অন্যের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হওয়া, হাদিয়া আদান-প্রদান করা, সেবা শুশ্রুষা করা, প্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে সান্ত্বনা দেওয়া, কাফন-দাফনে শরিক হওয়া, একে অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হয় এমন সব ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা। সবই একজন মুমিনের স্বভাবজাত বিষয়।
এক প্রতিবেশীর জন্য তার আরেক প্রতিবেশীর ওপর যেসব অধিকার রয়েছে, সেসব পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। এসব অধিকারের উল্লেখযোগ্য কিছু হলো প্রতিবেশীর চলার পথ সংকীর্ণ না করা, ছাদের পানি নিষ্কাশনের পাইপ ও বাড়ির সামনে আবর্জনা নিক্ষেপ করে কষ্ট না দেওয়া। কোনো প্রয়োজনে সাহায্য চাইলে- সহযোগিতা করা, অসুস্থ হলে সেবা করা, তার আনন্দে শরিক হওয়া, বিপদগ্রস্ত হলে সমবেদনা জ্ঞাপন করা, আগে আগে সালাম দেওয়া, কোমল ব্যবহার করা, প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় মায়া-মমতা দেখানো, দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণের রাস্তা দেখানো, তার সীমানা সংরক্ষণ করা, ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করা এবং কোনো গোপন বিষয় জানার চেষ্টা না করা। এসব কিছু সদ্ব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামি স্কলারদের মতে, প্রতিবেশী একটি ব্যাপক শব্দ। প্রতিবেশী বলতে মুসলিম, কাফের, নেক বান্দা, ফাসেক, বন্ধু, শত্রু, পরদেশি, স্বদেশি, উপকারী, ক্ষতি সাধনকারী, আত্মীয়, অনাত্মীয়, নিকটতম বা তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী সবাই অন্তর্ভুক্ত। অনেকেই মনে করেন, প্রতিবেশী বলতে শুধু ঘরের পাশের প্রতিবেশী বোঝানো হয়। বিষয়টি এমন নয়, শুধুমাত্র ঘরের পাশের প্রতিবেশীকেই প্রতিবেশী বলা হবে আর কাউকে নয়। বরং প্রতিবেশী বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করলে সে আমার প্রতিবেশী, ছাত্রজীবনে যাদের সঙ্গে পড়ালেখা-ওঠাবসা করি সেও প্রতিবেশী, আমার জমিনের সঙ্গে যদি কারও জমি থাকে সে জমিনের প্রতিবেশী, পাশের দোকানদার সে দোকানের প্রতিবেশী, একসঙ্গে বাজারে গেলে সে বাজারের প্রতিবেশী, এমনকি যদি আমি কোনো গাড়ি বা বিমানে একজন ভাইয়ের সঙ্গে পাশাপাশি বসি সেও কিছু সময়ের জন্য প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, এটা ইসলামের হুকুমও বটে। প্রতিবেশী প্রসঙ্গে কোরআনে করিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইবাদত করো আল্লাহর, তার সঙ্গে অপর কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সঙ্গে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয় এতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির ও নিজের দাসদাসীর প্রতিও সদয় আচরণ কর।’ সুরা নিসা : ৩৬
বর্তমান সমাজের অনেকেই প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণের বিষয়ে যতœবান নন, এমনকি অনেকের প্রতিবেশী তাদের অন্যায়-আচরণের কারণে শান্তিতে বসবাস করতে পারছে না, ফলে সবসময় ঝগড়া-ফ্যাসাদ হতে দেখা যায়। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অনেক আলেম এমনও পরামর্শ দেন, নিজের ছেলে-মেয়েদের জন্য ভালো খাবার কিনে আনলে সম্ভব হলে এর কিছু অংশ প্রতিবেশীর সন্তানদের দেওয়া। দিতে না পারলে সন্তানদের অন্তত এটা শেখানো, যারা সামর্থহীন, তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে কোনো খাবার না খাওয়া। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হে আবু যর! যখন তুমি ঝোল (তরকারি) রান্না করবে, তখন তাতে পানির পরিমাণ বেশি করো। অতঃপর তোমার প্রতিবেশীর বাড়িতে পৌঁছে দাও।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৬২৫
আরেকটি কথা, প্রতি পাড়ায় এমন কিছু প্রতিবেশী থাকেন, যারা সব বাড়ি থেকে খবর সংগ্রহ করে এর বাড়ি, ওর বাড়ি বিলি করেন এবং সবসময় খবরের সন্ধানে থাকেন। একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ানো তাদের অভ্যাস। আপনার সামনে সে হয়তো, ভালো মানুষ সেজে থাকবেন, কিন্তু পেছনে কটু কথা শোনাতে ছাড়বে না। এমন লোকের সঙ্গ এড়িয়ে চলা। তবে তার বিপদে এগিয়ে আসা। ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রতিবেশী যদিও বখাটে কিংবা দুশ্চরিত্র হয় এবং তার দ্বারা কোনো অনিষ্ট হয়, তাহলেও তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে নেই। প্রতিবেশী হতাশাগ্রস্ত হলে তাকে উত্তম উপদেশ ও পরমার্শ দেওয়া। অসুস্থ হলে সেবাযতœ করা। এমনকি প্রতিবেশী যদি অমুসলিম হয় তবুও তার বিপদে এগিয়ে যাওয়া।