‘বিশ্বভালোবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন’ এ প্রতিপাদ্যকে উপজীব্য করে প্রতিবারের মতো আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার সুন্দরবন দিবস পালিত হচ্ছে। করোনা মহামারীর কারণে এবারও সীমিতভাবে দিবসটি পালিত হবে।
পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সুন্দরবনকে সুরক্ষিত করতে পারলে বাংলাদেশ নিরাপদ হবে। ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে দুটি বাঘের মৃত্যু পরিবেশ ও প্রতিবেশপ্রেমীদের আহত করেছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে সুন্দরবনে রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ।
সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের কর্মকর্তা এম এ হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও বন বিভাগ অনেক বেশি সোচ্চার। তারা পর্যটকদের নিরাপদ রাখতে যেমন কাজ করে, তেমনি তাদের দ্বারা যেকোনো ক্ষতিসাধন বন্ধে সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর হয়ে থাকে।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন নানাভাবে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে সুন্দরবন। বনের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদ-নদীতে চর পড়ে পানিপ্রবাহ ও নাব্য বাধার মুখে পড়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৮ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং এমনকি তা ২৬ থেকে ৫৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। গড় তাপ, তাপদাহ ও তীব্র বৃষ্টিপাত বাড়বে ব্যাপক হারে। খরা ও মৌসুমি ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপকতা এবং উঁচু জোয়ারের প্রচন্ডতা বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায়। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় ১৯৮০ সালে এ অঞ্চলে ৩৫ শতাংশ, ১৯৮৯ সালে ৪০ শতাংশ, ২০০১ সালে ৫০ শতাংশ ২০১০ সালে প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষি ও বসতি জমি স্বল্প অথবা দীর্ঘ মেয়াদি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে মরে যাচ্ছে এ অঞ্চলের ছোট-বড় সব নদী।
সুন্দরবনের বড় অংশ ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার (৬২ শতাংশ) এলাকা বাংলাদেশে। এর মধ্যে ৪১৪৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি এবং ১৮৪৭ বর্গকিলোমিটার জলাধার।
গত দুই দশকে খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে ৩০টি বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ের ব্যবধানে ২৫টিরও বেশি বাঘের চামড়া আটকের ঘটনা ঘটেছে। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যাও কমছে। বেসরকারি হিসাবে, ২০০৪ সালে বনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৬০। বর্তমান সময়ে তা দাঁড়িয়েছে ১০৬টিতে।
সুন্দরবন দিবস উপলক্ষে সুন্দরবন একাডেমির উদ্যোগে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পিরোজপুর ও রাজধানী ঢাকার সুন্দরবনপ্রেমীদের অংশগ্রহণে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। সুশীলনের নির্বাহী প্রধান ও টাইগার পয়েন্টের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা নুরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুন্দরবন সুন্দরবনই। এর কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর ঐতিহ্য বৃহত্তম ও একমাত্র ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হলো সুন্দরবন। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের রক্ষায় সুন্দরবনের অভাবনীয় একটি সম্পর্ক রয়েছে।’
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং অনন্যসুন্দর প্রাকৃতিক এ সম্পদ সংরক্ষণে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবন একাডেমির আয়োজনে খুলনাসহ সুন্দরবনঘনিষ্ঠ জেলাসমূহে বেসরকারিভাবে সুন্দরবন দিবসের নানাবিধ কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। এবারের আলোচনাসভার মুখ্য বিষয় নির্ধারিত হয়েছে ‘সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান’।