বিদেশ সফরের রোগ সারবে কীভাবে

দেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থে নানা ছুতায় বিদেশ সফরের এক আশ্চর্য চেরাগের সন্ধান পেয়েছেন সরকারের কর্মকর্তারা। কখনো প্রশিক্ষণ, কখনো শিক্ষাসফর কিংবা সরেজমিন পরিদর্শনের মতো নানা নামে নানা কারণ দেখিয়ে এমন বিদেশ সফরে উচ্চপদস্থ সচিব থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত কেউই পিছিয়ে নেই। বিগত বছরগুলোতে নানা ঘটনায় এমন সব বিদেশ সফর নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও কিছুতেই তা কমানো যাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন বিদেশ সফরের রোগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখলেও তা বন্ধ হয়নি। ২০২০ সালের ১১ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত’ শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশ হয়। কিন্তু করোনা মহামারীর এই সময়েও সরকারের কর্মকর্তাদের প্রশ্নবিদ্ধ বিদেশ সফরের নানা খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে।

দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘হাঁড়ি-পাতিল কিনতে দুবাই ইস্তাম্বুল যাচ্ছেন এমডি’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ বিদেশ সফরের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘সোনারগাঁও হোটেল’-এর রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল কিনতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এবং তুরস্কের ইস্তাম্বুল যাচ্ছেন হোটেলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন আরও তিন কর্মকর্তাকে। সফরটি নিশ্চিত করার জন্য দলে ভেড়ানো হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিবকে (পিএস)। পাঁচ তারকা হোটেল সোনারগাঁওয়ের মূল রান্নাঘরের সংস্কার করার জন্য ৩০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ ছিল। এই কাজ সম্পাদনের জন্য সোনারগাঁও হোটেল পরিচালনাকারী সরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (হিল) কার্যাদেশ দেয় স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইন্টেরিয়রস-অ্যাকম জেবিকে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি তুরস্কের এ জাতীয় পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি উকজেন এন্ডাস্ট্রিয়েল উরুনলার সান-এর সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি করে। সে অনুযায়ী হোটেলের রান্নাঘরের যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নির্মাণশৈলী এবং প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শনের (পিএসআই) জন্য তুরস্কের কোম্পানিটি গত বছর ৫ অক্টোবর আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। ঠিকাদারের সঙ্গে হিলের সম্পাদিত চুক্তির শর্তে এই দুটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ভ্রমণের ব্যয় ঠিকাদারেরই বহন করার কথা রয়েছে চুক্তিতে। কিন্তু এক্ষেত্রে দুই কারণে সফরটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, অভিযোগ উঠেছে রান্নাঘরের আধুনিক মানের চুলা, হাঁড়ি-পাতিল, খুন্তি বা অন্যান্য যেসব জিনিসপত্র দেখার জন্য প্রতিনিধিদল ওই দেশে যাচ্ছে তার আগেই কার্যাদেশের ৭০ ভাগ মালামাল জাহাজে তুলে দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই তা হোটেল কর্র্তৃপক্ষের বুঝে নেওয়ার কথা। তাহলে এই সফরের কী অর্থ থাকতে পারে? দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফরের ব্যয় ঠিকাদার বহন করলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এই অর্থ তারা পণ্যমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়ে নেয়। তাই এই সফরের শর্তটি না থাকলে সমপরিমাণ অর্থের কম মূল্যেই পণ্যগুলো কেনা যেত। অর্থাৎ, এই সফরটি কার্যত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য একরকম উপহার ছাড়া আর কিছুই নয়। স্মরণ করা যেতে পারে, সম্প্রতি কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর নিয়ন্ত্রণের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি কিছু শর্ত যুক্ত করেছিল। কিন্তু একই মন্ত্রণালয়ের অধীন এই পাঁচ তারকা হোটেলটির কেনাকাটায় ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই আবারও এমন বিদেশ সফরে যাচ্ছেন।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ ধরনের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তারাও টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন কিংবা সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য সফরে যাচ্ছেন। পাঁচ তারকা সোনারগাঁও হোটেলের এমডি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিবের সরেজমিন পরিদর্শনের বিষয়টিও তাই নয় কি? জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে পরিচালিত সরকারের কর্মকর্তারা যখন এভাবে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য বিদেশ সফর করেন সেটা মেনে নেওয়া যায় না। নানা দপ্তরের কর্মকর্তাদের এমন বিদেশ সফরের প্রবণতা যে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে তা সংবাদ শিরোনামগুলো দেখলেই বোঝা যায়। ‘একটি ক্যামেরা কিনতে তিনজনের বিদেশ সফর’, ‘নলকূপ খনন শিখতে একাধিক কর্মকর্তার বিদেশ সফর’, ‘পুকুর খননে দক্ষতা অর্জনে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর’, ‘লিফট কিনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষক ও কর্মকর্তার সুইজারল্যান্ড ও স্পেন সফর’ এমন কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা পরিদর্শনের বদলে এ ধরনের প্রমোদভ্রমণের ফলে শুধু দেশের অর্থই অপচয় হচ্ছে না, বাস্তব দক্ষতার বিকাশ থেকেও কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিভিন্ন প্রকল্প এবং দেশের ওপরই পড়বে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবশ্যই দেশের টাকার এমন অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।