পুতিনে তাকিয়ে বিশ্ব

আঞ্চলিক ভূরাজনীতি যে বৈশ্বিক রাজনীতিকেও প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে তার প্রমাণ ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট। মস্কোর নির্দেশে সেনাবাহিনী ইউক্রেনে হামলা চালাবে কি না তা নিয়ে শুধু কিয়েভ নয়, গোটা বিশ্বই দ্বিধান্বিত। ক্রিমিয়া যুদ্ধের সময়ও ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইস্যু বৈশ্বিক রাজনীতিকে এতটা প্রভাবিত করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেভাবে প্রতিদিন একের পর এক আশঙ্কাপূর্ণ বিবৃতি দিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে রাশিয়া যেকোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে ইউক্রেনের ওপর। বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আঞ্চলিক ভূরাজনীতি প্রশ্নে এতটা উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যায়নি ইউরোপ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট ইউরোপের স্নায়ুবিক দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। ইউরোপ যে অন্যের শক্তিতে বলিয়ান তা ফের প্রমাণ হচ্ছে। সবাই তাকিয়ে আছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দিকে, নিকট ভবিষ্যতে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন, তাই দেখার বিষয়। গত সোমবারের বৈঠকের পর ক্রেমলিনের বিবৃতি বলছিল যে, পুতিন এখনো আলোচনার টেবিলকেই প্রাধান্য দিতে চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার ইউক্রেন সীমান্ত থেকে কিছু সৈন্যকে প্রত্যাহার করে নিতেও দেখা যায়। কতসংখ্যক সৈন্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে ইউক্রেন সীমান্তে ১ লাখ ৩০ হাজার রুশ সেনা মোতায়েন করেছেন পুতিন।

দ্বিধায় ভুগছে কিয়েভ। দেশটির তরুণ নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির জন্য এ সংকট বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। দেশটিতে চাপা উত্তেজনা এতটাই প্রকট যে, এবারের ভালোবাসা দিবসে দেশটির জনগণকে উদযাপন করতে দেখা যায়নি। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে স্বেচ্ছায় পরিখা খনন করতে যাচ্ছেন তরুণরা। ইউক্রেনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও সুবিধার নয়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে তথ্যযুদ্ধ চালাতে গিয়ে ওয়াশিংটন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো প্রমাণ দেখাতে পারছে না। খোদ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টই বলছেন, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে এমন কোনো প্রমাণ তার কাছে নেই। আজ যদি ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়, তাহলে গোটা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করার জন্য দোষী হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপে কোনো যুদ্ধ হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদের হবে। কারণ করোনা মহামারী ও অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির কারণে আমেরিকানদের উচ্চমূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে হচ্ছে। জ¦ালানির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপে জ¦ালানি সরবরাহকারী হিসেবে মুনাফা কামিয়ে নিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাটরা এমন সুযোগ ছাড়তে চাইছেন না।

সবকিছু নির্ভর করছে পুতিনের ওপর। ইউক্রেন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলগুলোকে আবারও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে চান। ‘গ্রেটার রাশিয়া’বিষয়ক স্বপ্ন রয়েছে পুতিনের। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই পুতিন বারবার ওয়ারশ চুক্তি মানতে বলছে ইউক্রেনকে। আর কিয়েভ এ চুক্তি এড়িয়ে ন্যাটোর সদস্য হতে চাইছে। এখানেই আপত্তি পুতিনের। এখন ইউক্রেন যদি ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা ত্যাগ করে, তাহলেই হয়তো পুতিনকে যুদ্ধের রাস্তা থেকে সরে আসতে দেখা যেতে পারে। তবে একদল বিশ্লেষক মনে করেন, ইউক্রেন সংকটকে ঢাল করে পুতিন ইতিমধ্যেই অনেক স্বার্থসিদ্ধি করে ফেলেছেন। এ সংকটের কারণেই এমন অনেক নেতা মস্কো সফর করেছেন বা করছেন, যারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে করতেন না। আবার এ সংকটের মধ্যে মস্কোতে নিজের বিরোধী শক্তিকেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি।