সব গোনাহ কি মাফ হয়?

অনেকের প্রশ্ন, কবিরা ও সগিরা সব গোনাহ কি মাফ হয়? ইসলামি স্কলারদের উত্তর, হ্যাঁ; করুণাময় আল্লাহতায়ালা চাইলে সব গোনাহ মাফ করতে পারেন। তবে কোরআনে করিমে বলা হয়েছে, তিনি শিরকের গোনাহ ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্যান্য গোনাহ মাফ করবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তার সঙ্গে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ ও যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।’ সুরা আন নিসা : ৪৮

শিরক ছাড়া অন্যান্য কবিরা গোনাহ থেকে মাফ পেতে তওবার বিধান রয়েছে। কিন্তু সগিরা গোনাহ মাফের জন্য সবসময় তওবার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন কিছু আমলের মাধ্যমে এসব ছোট-খাট গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তাই কবিরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে সগিরা গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যদি নিষেধকৃত কবিরা গোনাহগুলো (গুরুতর বড় পাপ) পরিহার করো, তাহলে (আল্লাহ) তোমাদের (ছোট) লঘুতর পাপগুলোকে মোচন করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে (জান্নাতে) প্রবেশ করাব।’ সুরা আন নিসা : ৩১

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ছোট-খাট অপরাধ ছাড়া কবিরা গোনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে। নিশ্চয় তোমার রব অপরিসীম ক্ষমাশীল।’ সুরা আন নাজম : ৩২

গোনাহ ক্ষমা প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজানের মধ্যে সংঘটিত (সগিরা) গোনাহ মুছে ফেলে, যদি কবিরা গোনাহ থেকে সে বেঁচে থাকে তাহলে (নতুবা নয়)।’ সহিহ্ মুসলিম : ৫৭৪

অর্থাৎ কেউ যদি ফজরের নামাজ আদায় করে, তারপর জোহরের সময় জোহরের নামাজ আদায় করে তাহলে সে ফজরের নামাজের পর থেকে জোহরের নামাজ পর্যন্ত যেসব সগিরা গোনাহ করেছে, জোহরের নামাজ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সেই গোনাহগুলো মাফ হয়ে যাবে। এভাবে এক জুমা আদায় করে পরের জুমার নামাজ আদায় করলে দুই জুমার মধ্যবর্তী সাত দিনের সগিরা গোনাহগুলো মাফ হয়ে যাবে। একইভাবে এ বছর যারা রমজানে রোজা পালন করেছে, পরবর্তী বছর রমজানের রোজা পালন করলে তার এই দুই রমজানের মধ্যের এক বছরের সগিরা গোনাহ মাফ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হচ্ছে, এই সময়গুলোতে কবিরা গোনাহ করা যাবে না।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজের সময় হলে, উত্তমরূপে অজু করে ভক্তি-বিনয়-নম্রতার সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে নামাজ আদায় করবে। তাহলে তার নামাজ পূর্বে সংঘটিত কবিরা গোনাহ ছাড়া অন্যান্য পাপরাশির জন্য মাফের অবলম্বন হয়ে যাবে। আর এ বিধান সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য।’ সহিহ্ মুসলিম : ৫৬৫

শরিয়তের বিধান মতে, সাধারণভাবে ভালো কাজ খারাপ কাজকে মুছে ফেলে। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় ভালো কাজগুলো মন্দকাজগুলোকে মিটিয়ে দেয়।’ সুরা হূদ : ১১৪

বর্ণিত কোরআনের আয়াত ও রাসুলের হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, কবিরা গোনাহ ছাড়া অন্যান্য গোনাহ আল্লাহতায়ালা স্বাভাবিক ও সাধারণ নেককাজের মাধ্যমে এমনিতেই ক্ষমা করে দেন। এ জন্য তওবা জরুরি নয়। বিভিন্ন আমলের মাধ্যমেই এসব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন হাদিস দ্বারা জানা যায়, কিছু কিছু কবিরা গোনাহও বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্লাহতায়ালা সৎকর্মের মাধ্যমে ক্ষমা করে দেন।

এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হজরত জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন, আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে (শিরক না করে) মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, ‘যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও? তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও।’ সহিহ বোখারি: ৬৪৪৪

অন্য হাদিসে আছে, হজরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আমি সেই জান্নাতি ব্যক্তি সম্পর্কে জানি, যে সবার শেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সবার শেষে জাহান্নাম থেকে বের হবে। সে এমন এক ব্যি ক্ত, যাকে কিয়ামতের দিন হাজির করা হবে এবং বলা হবে, তার ছোট-ছোট পাপগুলো পেশ কর এবং বড়-বড় পাপগুলো তুলে নাও। তারপর তার ছোট-ছোট পাপগুলো তার কাছে পেশ করা হবে এবং বলা হবে, তুমি অমুক দিনে এই পাপ করেছ, অমুক দিনে এই এই পাপ করেছ? সে বলবে, হ্যাঁ। সে তো অস্বীকার করতে পারবে না। সে তার বড় পাপগুলো পেশ করার ভয়ে ভীত থাকবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমার প্রত্যেক পাপের স্থলে একটি করে পুণ্য দেওয়া হলো। তখন সে বলবে, হে আমার রব! আমি তো অনেক কিছু (এমন পাপ) করেছি, যা এখানে আমি দেখতে পাচ্ছি না। এ ঘটনা বর্ণনা করে নবী করিম (সা.) এমনভাবে হেসে ফেললেন, যাতে তার মাড়ির দাঁতগুলো প্রকাশিত হয়ে গেল।’ সহিহ মুসলিম : ৪৮৭

উপরিউক্ত বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহতায়ালা বিশেষ প্রেক্ষাপটে কিছু কবিরা গোনাহ বান্দার অজান্তে তওবা ছাড়াও ক্ষমা করেন। কবিরা গোনাহ ক্ষমা সম্পর্কে কাজি ইয়াজ (রহ.) বলেন, ‘কবিরা গোনাহ শুধু তওবা অথবা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের মাধ্যমে মাফ হয়। আল্লাহ অধিক জানেন।’ শারহু সহিহ্

মুসলিম : ৩/১০৬-১২৭

অধিকাংশ আলেমদের মতে, আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্যমূলক বিভিন্ন আমল এবং ফরজ আমল সগিরা গোনাহকে মাফ করিয়ে দেয়; কবিরা গোনাহ মাফ করায় না। যা আলোচনার প্রথমদিকের দলিলগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। কবিরা গোনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য অবশ্যই তওবা করতে হবে।

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহ.) আলেমদের মতভেদ উল্লেখের পর বলেন, ‘আমরা এরূপ কথা বলা (মতভেদ করা) থেকে নীরব থেকে আল্লাহর কাছে এই আশা করি, তিনি (সগিরা-কবিরা) সব গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। বিশেষ করে যখন হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তার পাপ সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হলেও মাফ হয়ে যাবে।’ আর আল্লাহর কাছে এই আশা রাখব, কবিরা গোনাহ থেকে বিরত না থাকলেও সে ক্ষমা বহাল থাকবে। বলাবাহুল্য, এ কথা বিচ্যুতি থেকে অধিক দূরে এবং আশার ব্যাপারে বেশি বলিষ্ঠ।’ শারহু বুলুগিল মারাম : ৭/৫৪

এ বিষয়ে বুজুর্গ আলেমদের মতামত হলো, আল্লাহ গাফুর (ক্ষমাশীল), রহিম (দয়ালু) ; তিনি চাইলে যেকোনো অসিলায় মানুষের সব গোনাহ মাফ করে দিতে পারেন। অতএব, আমরা সর্বদা গোনাহ মাফের ব্যাপারে আশাবাদী থাকব, কখনো নিরাশ হবো না। আশাবাদী থাকাই মানুষের জন্য কল্যাণকর।