মাত্র দশ বছর আগে বরিশাল থেকে কাজের সন্ধানে নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকায় এসে টিনের ঘরে ওঠেন শাহীনেরা। তার বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। এতে পরিবারের ব্যয় চালাতে হিমশিম তৈরি হলে বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন শাহীন। পরে একটি কারখানায় কাজ নেন শ্রমিক হিসেবে।
এর মধ্যেই রাতারাতি পাল্টে যেতে থাকে তার ভাগ্যচক্র। এলাকায় কয়েকজন যুবক মিলে গড়ে তোলেন একটি বাহিনী। তারপর তল্লা এলাকার মাদক কারবারি সরোয়ারকে সরিয়ে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি ৬-৭টি বাড়ি এবং কোটি কোটি টাকার মালিক।
অনেকে তাকে ‘বরিশাইল্লা শাহীন’ নামেই চেনেন। বেশ কয়েকবার বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। বিভিন্ন থানায় তার নামে রয়েছে ৮টি মাদক মামলা। সম্প্রতি একটি মাদক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করতে এলে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ফের আলোচনায় এসেছেন তিনি।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শাহীনের নামে প্রায় ৮টি মাদক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ফতুল্লা মডেল থানায় ৬টি এবং সদর মডেল থানায় দুইটি। গত বছর ১২ মার্চ ফতুল্লা সবুজবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক লাখ ২৩ হাজার ইয়াবাসহ শাহীন ও তার সহযোগী শাহ আলম, আল আমিন, নাছির, আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শাহীনের উত্থান সিনেমার গল্পের মতোই। দিনে এলাকার বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসায় টাকা পয়সা দান করেন। আর রাতে চলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শহরজুড়ে মাদক কারবার। এখন তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন কয়েকশ যুবক। এমনকি ‘নবাবি স্বভাবে’ তার পায়ের জুতা পরানোরও আলাদা লোক রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর শাহীন স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় গড়ে তোলেন মাদকের বিশাল সিন্ডিকেট। বর্ডার এলাকা থেকে মাদক কারবার করতে গিয়ে গড়ে ওঠে সিন্ডিকেট নেটওয়ার্ক। গত বছর শহরের বড় মাদক স্পট চানমারী বস্তি উচ্ছেদের পর তল্লা রেললাইনের বিশাল এলাকায় শাহীনের মাদক কারবার আরও জমজমাট হয়ে ওঠে।
স্থানীয়রা আরও জানান, ওয়ান ইলেভেনের আগে চানমারি রেললাইন থেকে শুরু করে আজমেরী বাগ এবং তল্লা জেমস ক্লাব এলাকার আধিপত্য নিয়ে হেরোইন ব্যবসা করতেন সারোয়ার। সারোয়ারকে সরিয়ে দেয়ার পর গত দশ বছরে ওই এলাকার ডন হয়ে ওঠেন শাহীন।
শাহীন তার এসব কার্যক্রম চালানোর জন্য তৈরি করেছেন টর্চার সেল। তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে তার বাহিনী তাকে তুলে নিয়ে সেই টর্চার সেলে নির্যাতন চালান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, ২০০৯ সালে শাহীন ও তার পরিবার তল্লা পোড়া মসিজেদের পেছনে একটি টিনের ঘরে ভাড়া থাকতেন। তখন তার বাবা রাজমিস্ত্রি হিসেবে আর শাহীন বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। পরে একটি গার্মেন্টস কারাখানায় প্রিন্ট সেকশনে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। অল্প টাকার রোজগারে পরিবারের টানাপোড়েনে তিনি পথ খোঁজেন বেশি আয়ের। আর সেই থেকে সারোয়ারকে সরিয়ে বৃহত্তর তল্লা এলাকার রাতারাতি মাদক ডন বনে যান শাহীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন জানান, বর্তমানে ফতুল্লা বন্দরে ৬টি বাড়ির মালিক শাহীন। ফতুল্লা চটলার মাঠ এলাকায় ১০ তলা ফাউন্ডেশনের তিনতলা কমপ্লিট বাড়িও রয়েছে তার। এ ছাড়া বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় শাহীন ও তার বাবা-মায়ের নামে রয়েছে আরও কয়েকটি বাড়ি।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে তল্লা এলাকায় অভিযানে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করে শাহীন ও তার বাহিনী। এ ঘটনায় ১২ জন গ্রেপ্তার হলেও শাহীনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ফতুল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ রাকিবুজ্জামান বলেন, ‘অপরাধীরা কেউ ছাড় পাবে না। তাদের আইনের আওতায় এনে আদালতে সোপর্দ করা হবে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শহীনসহ বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহীনের ঘনিষ্ঠ একজন জানান, ঘটনার পর শাহীন তার ১৮ সহযোগীকে নিয়ে কক্সবাজারে চলে গেছেন। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তাকে যেন গ্রেপ্তার করতে না পারে এ জন্য তিনি আপাতত কিছুদিন শহরের বাইরে আত্মগোপন করবেন।
এদিকে ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার ১২ সহযোগীকে ছাড়ানোর জন্য শাহীনের ক্যাশিয়ার কবির হোসেন বাবু দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া শাহীনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে আছেন শাহ আলম।