হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।’ সহিহ্ বোখারি : ৬০১৮
অতিথির সমাদর, সেবা-যত্ন ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। সাধ্যানুযায়ী অতিথির আদর-আপ্যায়ন করা মুমিন-মুসলিমের কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে হাদিসে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক লোক নবী (সা.)-এর খেদমতে এলো। তিনি (সা.) তার স্ত্রীদের কাছে লোক পাঠালেন। তারা জানালেন, আমাদের কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কে আছ যে এই ব্যক্তি কে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিজের সঙ্গে খাওয়াতে পারো? তখন এক আনসারি সাহাবি (আবু তালহা রা.) বলেন, আমি। এই বলে তিনি মেহমানকে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মেহমানকে সম্মান করো। স্ত্রী বলেন, বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই। আনসারি বলেন, তুমি খাবার প্রস্তুত করো এবং বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। সে বাতি জ্বালাল, বাচ্চাদের ঘুম পাড়াল এবং সামান্য খাবার যা তৈরি ছিল তা উপস্থিত করল। বাতি ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অন্ধকারের মধ্যে আহারের মতো শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে লাগলেন যে তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। তারা উভয়েই সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন। ভোরে যখন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলেন, তখন তিনি নবী করিম (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের গত রাতের কাণ্ড দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা বলেছেন খুশি হয়েছেন এবং এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন ‘তারা অভাবগ্রস্ত সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদের অন্তরের কৃপণতা হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।’ সহিহ বোখারি : ৩৭৯৮
বর্ণিত হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মেহমানের সমাদরের দ্বারা কারও রিজিক কমে না, মেহমানদারি করে কেউ সর্বহারা হয় না, বরং মেহমানদারি করে আল্লাহকে খুশি করা গেলে মহান আল্লাহই সফলতা দান করেন। সাহাবি হজরত আবু তালহা (রা.)-এর মেহমানদারিতে খুশি হয়ে মহান আল্লাহ যে আয়াতটি নাজিল করেছেন, এটা তার প্রমাণ।
অতএব মেহমানের জন্য খরচ করা অনর্থক কাজ নয়, বরং মেহমানের সমাদরের মাধ্যমে আমরা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অর্পিত দায়িত্ব পালন করি। অনেকের মনে হতে পারে, তাহলে কেউ যদি মাসের পর মাস মেহমান হয়ে আমার বাড়ি চলে আসে, তাহলে তো আমি তার কাছে জিম্মি হয়ে যাব। ব্যাপারটা আসলে তেমন নয়, ইসলাম কারও ওপর তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপায় না। মেহমানের হক একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক, তা পার হয়ে গেলে তার সমাদর করলে সওয়াব মিলবে, কিন্তু কোনো কারণে মেহমানদারিতে ব্যর্থ হলে গোনাহ হবে না।
এ প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক রাত মেহমানদারি করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। যার আঙিনায় মেহমান নামে, এক দিন মেহমানদারি করা তার ওপর ঋণ পরিশোধের সমান। সে ইচ্ছা করলে তার ঋণ পরিশোধ করবে বা ত্যাগ করবে।’ সুনানে আবু দাউদ : ৩৭৫০
মেহমানদারির অন্যতম উপকারিতা হলো, যারা অতিথিপরায়ণ, মহান আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত করেন না। তারা কঠিন বিপদ থেকে মহান আল্লাহর রহমতে নিষ্কৃতি পেয়ে যায়।