বাংলাদেশের কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক গাজী মাজহারুল আনোয়ার ২২ ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছরে পা দেবেন। এই বয়সে এসেও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এখনো মগ্ন থাকেন নতুন গানের স্বরলিপিতে। সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই বয়সে এসেও বসে নেই। মানুষ আমার কাছে নানা কিছু প্রত্যাশা করেন। তাই অনেকেই কাজ নিয়ে আসেন। কাউকে কাউকে পরামর্শ দিয়েও সহায়তা করতে হয়। ফলে এই সময়টা বসে থাকতে চাইলেও নিজের দায়িত্বের কারণে একেবারে বসে থাকা সম্ভব হয় না। আর আমি কাউকে ফেরাতেও পারি না। মানুষ আশা করে আসে তাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য আমাকে কিছু কাজ করতেই হয়। আর দ্বিতীয়ত, যত কাজ করা যায় ততই মানুষের আশীর্বাদ বেশি পাওয়া যায়। মানুষের জন্য যদি কিছু করে যেতে পারি, মানুষ যদি খুশি হয়। তাহলেই নিজেকে সার্থক মনে করি। আমি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই আরও কিছুদিন। আরও কিছুদিন লিখে যেতে চাই। দেশের কথা বলতে চাই, মানুষের কথা বলতে চাই। মানুষের জন্য আরও কিছু সৃষ্টি উপহার দিয়ে যেতে চাই। সৃষ্টির ভেতর দিয়েই আমি আরও কিছুদিন বাঁচতে চাই।’
সামনেই জন্মদিন। জন্মদিনে কোনো আয়োজন থাকছে কিনা জানতে চাইলে গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘কোনো পরিকল্পনা নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে হয়তো ছোটখাটো আয়োজন করা হবে।’
নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির প্রসঙ্গ তুললে মাজহার বলেন, ‘এই বয়সে এসে আমি মনে করি আরও কিছু কাজ যদি করে যেতে পারি, তাহলে ভালো হয়। কাজের মাধ্যমে যদি আরও কিছু মানুষকে জাতিকে দিয়ে পারি সেটাই হবে আমার প্রাপ্তি। আর আমার কোনো অপ্রাপ্তি নেই। মানুষ কাজ করে মূলত নিজেকে প্রস্ফুটিত করার জন্য। আমি প্রচুর কাজ করেছি এবং কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছি। বিভিন্ন সংগঠন ও রাষ্ট্রও আমাকে সম্মানিত করেছে। এজন্য সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমি এতটুকু বলব, আমি আমার কাজের মাধ্যমে মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার তুলনা নেই। আমি মনে করি আমার সকল প্রাপ্তির চেয়েও বড় প্রাপ্তি হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।’
এদিকে সংগীতাঙ্গনে দিন দিন গানের মান কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝেই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ইদানীং কাজের মান কমে যাচ্ছে। মান কমে যাওয়ার ব্যাপারে বলব, কাজ করার জন্য গান বা যেকোনো সৃষ্টিই হোক, কোনো কিছু সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট জ্ঞানটা থাকতে হয় ভেতরে। যদি সেই জ্ঞানটা না থাকে, তাহলে কাজের মান তো কমবেই। যার যে রকম যোগ্যতা সে সেই মানেরই তো সৃষ্টি করবে। সৃজনশীল ব্যক্তিরা যারা নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলে তাদেরই কাজের মান ভালো হয়। প্রাপ্তিটা তাদেরই হয়। ফলে যারা কাজ করছে তাদের আরও যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। মানুষের ভালোবাসা যদি প্রত্যাশা করে তাহলে তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।’
উল্লেখ্য, ২০ হাজার গানের রচয়িতা গাজী মাজহারুল আনোয়ার ১৯৬৪ সাল থেকে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখা শুরু করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই নিয়মিত গান ও নাটক রচনা করেন। প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখেন ১৯৬৭ সালে আয়না ও অবশিষ্ট চলচ্চিত্রের জন্য। ১৯৬৭ সালে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গান লেখাতেও দক্ষতা দেখান তিনি। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র নান্টু ঘটক ১৯৮২ সালে মুক্তি পায়। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ৪১টি। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ২০০২ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি স্বাধীন দেশের সর্বপ্রথম পুরস্কার বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিকবার বাচসাস পুরস্কার, বিজেএমই অ্যাওয়ার্ডসহ তার অর্জিত পুরস্কারের সংখ্যা ১১০।