কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় সিদ্দিকুর রহমান (৫০) নামে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন, যাদের তিনজন গুলিবিদ্ধ। গতকাল শুক্রবার সকালে চণ্ডীপুর পুঠিমারী বিলের চরে স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম মালিথা এবং ইউপি সদস্য এনামুল ইসলাম মণ্ডল সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়ে পুলিশ।
অন্যদিকে কুমিল্লার হোমনায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় মো. সালাউদ্দিন জহির (২৭) নামে এক যুবলীগকর্মীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে আসাদপুর ইউনিয়নের ঘনিয়ারচর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় নিহত সিদ্দিকুর রহমান মণ্ডল চাঁদগ্রাম ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি চরপাড়া গ্রামের ওমর মণ্ডলের ছেলে এবং ইউপি সদস্য এনামুল ইসলাম মণ্ডলের আপন ছোট ভাই। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, সংঘর্ষে জড়ানো দুপক্ষের নেতৃত্বে থাকা নজরুল ইসলাম মালিথা জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত; অন্যদিকে এনামুল ইসলাম মণ্ডল আওয়ামী লীগ অনুসারী। তিন-চার দিন আগে ইউপি সদস্য এনামুলের সমর্থকরা গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া জিকে খালে মাছ ধরতে যায়। তখন নজরুল মালিথার লোকজন তাদের ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। পরে গতকাল সকাল ৯টার দিকে এনামুলের সমর্থকরা ফের সেখানে মাছ ধরতে গেলে দুপক্ষ সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের পর গুলিবিদ্ধ চারজনকে উদ্ধার করে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সিদ্দিকুর রহমানকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংঘর্ষে আহত অন্যরা হলেন ইউনুস আলী (৪৫), আবদুল খালেক (৩৫), বাদশা মন্ডল (৩০), কুব্বাত আলী (৩৬), রানা মন্ডল (৩০) ও সুমন আলী (৩০)। এর মধ্যে ইউনুস, বাদশা ও রানা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তারা ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. নুরুল আমীন।
চাঁদগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বুলবুল কবীরের অভিযোগ, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকা জাসদ অনুসারী নজরুল মালিথার লোকজন এনামুলের লোকজনের ওপর হামলা চালায়। তিনি বলেন, ‘হামলার শিকার হয়ে এনামুলের লোকজন চিৎকার করে। চিৎকার শুনে বাড়ি থেকে আরও বেশ কিছু লোকজন সেখানে যায় আহতদের উদ্ধার করতে। কিন্তু এ সময় নজরুলের লোকজন গুলিবর্ষণ শুরু করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হাফিজ তপন জাসদ সমর্থিত হওয়ার কারণে তারা ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। আমি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চাঁদগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাফিজ তপন বলেন, ‘এই এলাকায় মণ্ডল ও মালিথা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব প্রায় ৬০ বছরের। মাঝেমধ্যেই তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটে। একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।’
নিহত সিদ্দিকুর রহমান মণ্ডলের ভাই এনামুল ইসলাম মণ্ডলের অভিযোগ, কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নজরুলের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। তারই জেরে পরিকল্পিতভাবে তার ভাই ও লোকজনের ওপর হামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যে সবার সামনে নজরুল মালিথার ছেলে রনি আমার লোকজনের ওপর গুলি চালিয়েছে।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চেষ্টা করেও নজরুল ইসলাম মালিথার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চরপাড়া গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভেড়ামারা থানার ওসি মজিবর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুপক্ষের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের জেরে সকালে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সিদ্দিকুর রহমানের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে পুলিশি অভিযান চলছে।’
কুমিল্লায় যুবলীগকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা : কুমিল্লার হোমনায় নিহত যুবলীগকর্মী সালাউদ্দিন জহির ঘনিয়ারচর গ্রামের রেনু মিয়ার ছেলে। তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সদস্য।
নিহতের বড় বোন পারুল আক্তারের অভিযোগ, কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার সমর্থক ছিলেন সালাউদ্দিন জহির। এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জালাল পাঠান। তিনি বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই হুমকিধমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে তেবাগিয়া-কলাগাছিয়া সেতুতে জহিরের ওপর হামলা চালায় জালাল পাঠানের লোকজন।
পারুল বলেন, ‘নৌকায় ভোট দেওয়ায় কাল হলো আমার ভাইয়ের। আমার ভাই জহিরকে পাচু রাজাকারের সন্তান জালাল পাঠানের সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হাতের আঙুল বিচ্ছিন্নসহ পায়ের ও ঘাড়ের রগ কেটে হত্যা করেছে। আমি এর বিচার চাই।’
নিহতের চাচা আসাদপুর ইউনিয়নের ঘনিয়ারচর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘আমার ভাতিজা জহির নৌকার প্রার্থী ছিদ্দিকুর রহমানের সমর্থক ছিল। এর জেরে জহিরকে একা পেয়ে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এমনকি কুপিয়ে আহত করার পরও জহিরকে উদ্ধার করতে দেয়নি সন্ত্রাসীরা। পরে রাতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ঢাকায় নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যান জালাল পাঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
যুবলীগকর্মী জহির হত্যার পর এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হোমনা থানার ওসি আবুল কায়েস আকন্দ। তিনি বলেন, ‘জালাল চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশেই নিহত সালাউদ্দিন জহিরের বাড়ি। এলাকার বাজার নিয়ে আধিপত্য, ডিশ ব্যবসা ও নির্বাচনসহ একাধিক দ্বন্দ্বের কারণে জালাল চেয়ারম্যানের সঙ্গে সালাউদ্দিন জহিরের বিরোধ ছিল।’