বিশ্বাস-ভালোবাসায় সাফল্য

ফাফ ডু প্লেসি বিপিএলে এই প্রথম। দক্ষিণ আফ্রিকা ফিরেছেন কাল। বাংলাদেশ সময় বিকেলে দেশে ফিরেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানালেন আমি পৌঁছেছি। বাকিদের স্বস্তির বার্তায় মেসেজের পরের অংশ ভরে উঠল। যেন পরিবারের একজন এই মাত্র বিদেশে নিজের গন্তব্যে পৌঁছলেন। নতুন চ্যাম্পিয়নদের দলে সবার ভালোবাসার চিত্র এমন। ঢাকা ছাড়ার আগে ডু প্লেসির মনে বিরহের সুর। তিনি যে পরিবার ছেড়ে যাচ্ছেন। ডু প্লেসির ক্যারিয়ারে ফ্র্যাঞ্চাইজির সংখ্যা অনেক, কিন্তু তার কাছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স শুধু দল নয়, এটা একটা পরিবার।

কুমিল্লার সাফল্যের মূলে ভালোবাসা। সেই সঙ্গে বিশাল জায়গা জুড়ে আস্থা বা বিশ্বাসের অবদানও আছে। আসরে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের নেতৃত্ব বদল নিয়ে যে নাটক হলো মালিক পক্ষের এমন হস্তক্ষেপ দলটিতে নেই। তাই ২০১৫ থেকে শুরু কুমিল্লায় অদলবদলও নেই খুব একটা। দলটির সঙ্গে প্রথম আসর থেকেই আছেন কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও মিডিয়া ম্যানেজার খান নয়ন। কুমিল্লার সবচেয়ে বড় শক্তি পরস্পরে বিশ্বাস বলে জানান নয়ন। বিপিএল ড্রাফটে  প্রতি দলেই যখন অদলবদলের সুর কুমিল্লা শুরুতেই জানিয়ে দেয় গতবারের অধিনায়ক ইমরুল কায়েস থাকছেন। পুরো আসরে তার নেতৃত্বে বাদ সাধেনি কেউ। তাই ফাইনালে ৩ ওভারে ২৭ রান দেওয়া শহিদুল শেষ ওভারে বল হাতে পান। আর মাঠে ইমরুলের এই সিদ্ধান্তেরও দ্বিমত করেনি কেউ। শহিদুলের ওপর বিশ্বাস রাখেন ইমরুল, অধিনায়কের ওপর দল।

দল পরিচালনায় দক্ষতা ভালোবাসার মাধ্যমেই ছড়িয়ে দিয়েছেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির চেয়ারপারসন নাফিসা কামাল। মিডিয়া ম্যানেজার নয়ন বলেন, ‘২০১৫ সালে শুরু থেকেই প্রতিটি সদস্যের ওপর তিনি আস্থা রেখেছেন। যে কোনো বিষয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে যে সৌহার্দ্য এটা অতুলনীয়। আমাদের টিম বয় থেকে সর্বোচ্চ কর্মকর্তা পর্যন্ত কাউকেই আলাদা চোখে দেখা হয় না। আমরা একটা পরিবার।’

কুমিল্লা ফ্র্যাঞ্চাইজির শুরু বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের হাতে। তিনি নিজেও কুমিল্লার মানুষ। তাই ক্লাবটির সঙ্গে কুমিল্লার মানুষের ভালোবাসা আছে বলে মনে করেন নয়ন। তাছাড়া কুমিল্লার ক্রিকেটারদের ওপর আলাদা করে নজর দেয় ফ্র্যাঞ্চাইজিটি, ‘আমরা কুমিল্লার ক্রিকেটারদেরও এগিয়ে রাখি। আবু হায়দার রনি, মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন ও মাহমুদুল হাসান জয়রা কুমিল্লার ছেলে আমাদের দলে খেলেছে। আমাদের ওপর কোনো সময় ওপর মহল থেকে কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না। যেমন ফাফ ডু প্লেসির মতো ক্রিকেটার থাকতেও আমরা জয়কে লিটনের সঙ্গে ওপেন করিয়েছি। আবার শহিদুল ফাইনালে ৩ ওভারে ২৭ রান দেওয়ার পরও ওকেই শেষ ওভারটা দেওয়া হয়। এখানে সবার প্রতি সবার যে বিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এটা অতুলনীয়।’

শুধু বিপিএলেই পড়ে থাকতে চায় না কুমিল্লা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতিতে অবদান রাখতে বিপিএলের একমাত্র দল হিসেবে অ্যাকাডেমি করেছে তারাই। কুমিল্লার লালমাইয়ের কলেজ মাঠে ‘কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স অ্যাকাডেমি’র পরিধি শুধু বাড়ছে। ২০১৫ সালে দলের সঙ্গে মাত্র ৫০ জন ক্রিকেটার নিয়ে শুরু, এখন তাদের ২৫০ জন ক্রিকেটার। আছে বয়সভিত্তিক দল ও বছরজুড়ে ক্রিকেটীয় কার্যক্রম। বিপিএলে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে নিজস্ব অ্যাকাডেমির ক্রিকেটারকে এবার দলে সুযোগ দিয়েছে কুমিল্লা। মেহেদী হাসান নামের ওই পেসার খেলেছেন প্রথম শ্রেণি ও লিস্ট ‘এ’-তে এবার আছেন বাংলাদেশ টাইগার্স দলের সঙ্গে অনুশীলনে। কুমিল্লা অ্যাকাডেমির হেড কোচ মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলছিলেন, ‘আমাদের এখন পর্যন্ত অর্জন বলতে গেলে মেহেদী হাসান। যদি ফ্র্যাঞ্চাইজির আলাদা লক্ষ্যের কথা বলি সেখানে আমরা আংশিক সফল। কারণ মেহেদীর জন্য এবারের বিপিএল সফলটা স্বপ্নের মতো। প্রথমত সে মোহাম্মদ সালাউদ্দিন স্যারের অধীনে ছিল। সেখানে অনেক কিছুই শিখেছে। পুরো আসরের সেরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে অনুশীলন করা, ড্রেসিংরুম শেয়ার করা এটা মেহেদীর জন্য বিরাট পাওয়া।’

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বছরে ৪ থেকে ৫টা টুর্নামেন্ট করে। এই টুর্নামেন্টগুলো থেকে সেরা ৪০ জন ক্রিকেটার নিয়ে আলাদা ক্যাম্পের আয়োজন করে কক্সবাজার স্টেডিয়ামে। উপজেলায় স্কুল ক্রিকেটের মাধ্যমে করে ক্রিকেটার হান্ট। উঠে আসা এই ক্রিকেটারদের স্বপ্ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে খেলা। কিন্তু আতিকুর জানান, তারা ভালো ক্রিকেটার তৈরি করতে চান, ‘এখানকার ক্রিকেটারদের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে খেলা তো অবশ্যই স্বপ্ন। ঘরের মানুষ ঘরের দলে খেলতে পারলে সেটা তো বড় প্রাপ্তিই হবে। কিন্তু আমরা চাচ্ছি এদের ভালো মানুষ-ভালো ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে যেন যে দলেই খেলুক কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স অ্যাকাডেমির নাম উজ্জ্বল করবে।’

ক্রিকেটারদের স্বপ্নটা বিস্তৃত করতে নিয়মিতই সেরা কোচরা ওই অ্যাকাডেমি পরিদর্শন করেন। ক্রিকেটারদের টিপস দেন। বিপিএল শেষে কুমিল্লার কোচিং উপদেষ্টা স্টিভ রোডসও গেলেন। অ্যাকাডেমির ক্রিকেটারদের জাতীয় পর্যায়ে খেলার স্বপ্নের পরিধিও বাড়িয়ে দিয়ে এলেন।