কোরআনে করিমের সুরা কাহাফে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যারা ভালো কর্ম করে, নিশ্চয় আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার বিনষ্ট করি না।’ আয়াতটি মুমিনদের জন্য সুসংবাদ। এমন প্রতিশ্রুতির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা হতে পারে না। আর মুমিন বান্দাই আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রাখে এবং তার ইনসাফের ওপর ভরসা করে ও তার অনুগ্রহের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। বর্ণিত আয়াত যেকোনো মুমিন-মুসলমানকে তার নিজের আমলের দিকে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ ইসলাম চায় শ্রেষ্ঠ ও উত্তম আমল। যে ব্যক্তি দ্বীন ও দুনিয়ার কাজে ইহসান অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালায়, পরিশ্রম করে ও একনিষ্ঠ থাকে এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে; তার জন্য তার রবের কাছে উচ্চ মর্যাদা রয়েছে এবং তার রব তাকে মহব্বত, নৈকট্য ও অনুগ্রহের দ্বারা সম্মানিত করবেন।
আমলে অমনোযোগিতা, আমলের ওয়াক্তের বিষয়ে উদাসীনতা, দুর্বল প্রস্তুতি, আমানতদারিতার ঘাটতি, সততার অভাব এবং বহুমুখী ফেতনার মধ্যে ইহসানের সঙ্গে আমল ছাড়া আমলের উৎকৃষ্টতা হারিয়ে সমাজ ও জাতি বিষণœ। এমন দৃশ্যাবলির সমাধানে কার্যকরী বিধান ও সুদৃঢ় আইন প্রণয়নের পাশাপাশি ইসলাম অতুলনীয় এক ঐশী নীতি এবং নজিরবিহীন নববি আদর্শ নিয়ে এসেছে। যা কার্যকর ও উপকারী ফলাফল বয়ে আনে। এই নীতি উদগত হয় গভীর ইমানের মর্ম থেকে, যা ইহসানকে লালন করে ও ইমানের বীজ বপন করে। তা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উক্তির মাধ্যমে বর্ণনা করে দিয়েছেন, ‘ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত পালন করবে, যেন তুমি তাকে (আল্লাহকে) দেখেছ। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও; তবে মনে করবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ সহিহ্ বোখারি
অর্থাৎ নামাজ আদায়ে, রোজা পালনে, হজব্রত পালনে, অজুর সময়, দান-সদকার সময় থেকে শুরু করে সব আমলের সময় এ কথা মনে রাখা, ‘আমি আল্লাহকে দেখছি, আর আল্লাহও আমাকে দেখছেন। এভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে না পারলে, অন্তত আল্লাহকে স্মরণে রেখে ও ভয় করে তার ইবাদত-বন্দেগি করা।’
এ মর্ম হৃদয়ে আয়ত্ত করতে পারলে, তখন তা আচার-আচরণে প্রকাশ পাবে। যথার্থভাবে আমল করতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং এর মাধ্যমে দেশ ও জাতির অবস্থা ত্রুটিমুক্ত হবে। কেননা এটি একনিষ্ঠতাকে নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠিত করে এবং মুসলিম জীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহর ভয়কে জিইয়ে রাখে; তাদের ইবাদতে, লেনদেনে, পারস্পরিক সম্পর্ক ও বেচা-কেনা ইত্যাদিতে।
এটি শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে সব দায়িত্বশীলের হৃদয়কে সজাগ করায়, সর্বোচ্চ মানসম্মত ও উৎকৃষ্ট আমল সম্পাদনে উৎসাহ জোগায়। কেননা তখন সবাই অনুভব করে, তার কর্মগুলো আল্লাহর নজরদারিতে রয়েছে। ফলে এটি তাকে বিশ্বাসঘাতকতা ও লোকদেখানো কাজ থেকে বিরত রাখে। তার সুপারভাইজার, অফিসের বস ও কর্মকর্তার নজরদারি এবং সুনাম অর্জনের প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে তাকে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ভয় এনে দেয়; ফলে সততা, উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে জাতি জাগ্রত হয়, এগিয়ে যায় ও সমৃদ্ধি লাভ করে। মূলত : সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অসংগতি, এগুলো সৎকর্ম বাস্তবায়নের ঘাটতি ও কাজের দক্ষতার অভাবের কারণে হয়।
যখন কোনো মুসলিমের ইবাদতে, তার নামাজে, তার চলা-ফেরা, ওঠা-বসা ও কর্মক্ষেত্রে ইহসান থাকবে; তখন তা তাকে একজন সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও সৎকর্মশীল মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলবে। তাকে নিজ পেশা ও কর্মে দক্ষ করবে এবং তাকে ধন-সম্পদ, সুস্থতা ও সন্তানাদিতে বরকতময় করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা ইহসান (সৎকর্ম) কর, নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’সুরা আল বাকারা : ১৯৫
যে ব্যক্তি ইহসান করে তার ওপর আল্লাহতায়ালাও ইহসান করেন মর্মে কোরআনে করিমে অসংখ্য নমুনা রয়েছে; যাতে নিজ কর্মে দক্ষ ও মুহসিন ব্যক্তি ইহসানের ফল ও বিশাল প্রতিদান দেখতে পায়। আসমান ও জমিনের মালিক আল্লাহর পক্ষ থেকে অঢেল দান ও অনুগ্রহ অবলোকন করতে পারে। কাজেই তিনি কি ইহসানকারী বান্দার প্রতিদান ইহসানকে বিনষ্ট করতে পারেন অথচ সে মহান আল্লাহর এ বাণী শুনেছে, ‘ইহসানের প্রতিদান ইহসান ছাড়া আর কী হতে পারে?’ সুরা আর রহমান : ৬০
আল্লাহর নবী হজরত ইউসুফ (আ.) তার অতুলনীয় সৌন্দর্যের নেয়ামতকে সচ্চরিত্রবান থাকা ও আমানতদারিতার মাধ্যমে সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে তার এ ইহসানকে মহান আল্লাহ নবুওয়ত, নেতৃত্ব ও উচ্চ মর্যাদা দানের মাধ্যমে হেফাজত করেছেন। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ রোগগ্রস্ত থেকেও ধৈর্য ধারণ করেছিলেন, ফলে মহান আল্লাহ তার বিশাল দয়া ও বরকতময় বহু কল্যাণ দান করে তার প্রতি ইহসান করেছেন।
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর হেরা গুহায় যখন ফেরেশতা নাজিল হন; তখন তিনি স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) কে ঘটনা বৃত্তান্ত জানিয়ে বললেন, ‘আমি নিজেকে নিয়ে শঙ্কাবোধ করছি।’ তখন হজরত খাদিজা (রা.) বললেন, ‘আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না; আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সত্য কথা বলেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানদারি করান এবং হকের পথে আসা দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।’ কাজেই যে ব্যক্তি তার সমাজ, জাতি ও দেশের প্রতি কল্যাণমূলক কাজ করে ইহসান করে, আল্লাহতায়ালা তাকে কখনো অপদস্থ করবেন না।’
হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নবী করিম (সা.)-কে সঙ্গ দিয়ে এবং তাকে সর্বদা সমর্থন করেছেন, আল্লাহতায়ালাও তাকে শেষ নবী করিম (সা.)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ে, উম্মতের খলিফা নির্ধারণ করে তার প্রতি ইহসান করেছেন। হজরত উসমান (রা.)-কে আল্লাহতায়ালা ব্যাপক ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন। তিনি তা দান-সদকা ও ভালো কাজে খরচ করার মাধ্যমে সদ্ব্যবহার করেছেন। আল্লাহতায়ালা তার দীর্ঘ সুনাম ও উপকারিতা অব্যাহত রেখে এবং অসামান্য প্রতিদান ও অঢেল সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি ইহসান করেছেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, বান্দা ভালো আমল করলে আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম, পরিপূর্ণ ও বিশাল প্রতিদান দান করেন।
প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের জানা উচিত, তার ইহসান ও সৎকর্ম মূলত তার ওপর আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের শোকরিয়া আদায়ের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যাকে আল্লাহ ধনসম্পদ, যশ-খ্যাতি ও জ্ঞান-বিদ্যায় প্রাচুর্যতা দিয়েছেন; তার উচিত সেগুলোকে বৈধ পন্থায় ব্যবহার করে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা।
১৮ ফেব্রুয়ারি মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান