বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুনাম কুড়ানোর পর এবার দেশে মুক্তি পাচ্ছে মেধাবী নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্র ‘শিমু’। দর্শক ছবিটির নাম শুনে মনে করতে পারেন এটি সদ্য নির্মিত নতুন ছবি। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। এই ছবি সম্পর্কে অনেকেই অবগত। কারণ ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ নামে ছবিটির অনেক সাফল্যগাথা এত দিনে সিনেমাপ্রেমীদের জানা। এবার ছবিটির নাম বদলে ‘শিমু’ নামে বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে। নাম বদল কেন? তার কারণ জানালেন নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন, ‘জানুয়ারিতে মুক্তির কথা ছিল। কিন্তু কভিডের কারণে আমরা পিছিয়ে গেলাম। শুরুতে আমাদের সিনেমার নাম “শিমু” ছিল। পরে তার পরিবর্তন করে “মেইড ইন বাংলাদেশ” রাখা।’ কাকতালীয়ভাবে এই ছবির কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীর নামও শিমু। শুধু তা-ই নয়, ছবিতে তার চরিত্রের নামও শিমু। বিষয়টি নিয়ে দারুণ উদ্বেলিত অভিনেত্রী রিকিতা নন্দিনী শিমু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক বছর ধরে সিনেমায় কাজ করছি। শুরুটা প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের সিনেমা ‘রানওয়ে’ দিয়ে। এরপর ইমতিয়াজ আহমেদ বিজন পরিচালিত ‘মাটির প্রজার দেশে’ ও রুবাইয়াত হোসেনের ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ ও ‘শিমু’ ছবিতে কাজ করা। খুব বেছে, গল্পনির্ভর সিনেমায় কাজ করেছি। তবে এবারের জার্নিটা সত্যিই আলাদা। গল্পটি আমাকে ঘিরে। ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ সিনেমায় এই শিমু চরিত্রেই আমি অভিনয় করেছিলাম। পরে সেই চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ জার্নি নিয়ে নতুন ছবি নির্মাণ করেন নির্মাতা। যার নাম এখন শিমু। এত দ্রুত নাম ভূমিকায় সিনেমায় অভিনয় করব ভাবিনি। তার ওপর চরিত্রটির নাম আর আমার বাস্তবের নাম একই। সব মিলিয়ে অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করছে। সততার সঙ্গে কাজটি করেছি। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। সিনেমার ট্যাগ লাইনে বলা হচ্ছে, আমি-ই শিমু, আমি-ই বাংলাদেশ! আশা করছি বাংলাদেশের অরিজিনাল গল্পটি দেখতে সবাই প্রেক্ষাগৃহে আসবেন।’
নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতিকূলতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে চলা প্রতিটি সংগ্রামী মানুষের গল্পই “শিমু”। সমতার প্রশ্নে “শিমু” একজন সম্মুখযোদ্ধা। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে বাংলাদেশের সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে ছবিটি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে পোশাকশিল্পের যে ভূমিকা আছে তার আলোকে দৃঢ়চেতা নারী পোশাকশ্রমিকদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প বলা হয়েছে “শিমু” চলচ্চিত্রে। ভালো লাগার বিষয় হলো শুধু নির্মাতা হিসেবে আমিই নই, এ ছবিটির মূল কুশলীদের অধিকাংশই ছিলেন নারী। চিত্রগ্রহণে সাবিন ল্যাঞ্চেলিন, শব্দগ্রহণে এলিশা আলবার্ট এবং শিল্প নির্দেশনায় জোনাকি ভট্টাচার্য্যরে নাম উল্লেখযোগ্য।’
ছবিটির অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন নভেরা রহমান, দীপান্বিতা মার্টিন, পারভীন পারু, মায়াবি মায়া, মোস্তফা মনোয়ার, শতাব্দী ওয়াদুদ, জয়রাজ, মোমেনা চৌধুরী, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, সামিনা লুৎফা প্রমুখ। দুটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিতা চৌধুরী ও ভারতের শাহানা গোস্বামী।
২০১৬ সালের লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে ওপেন ডোরস ল্যাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চলচ্চিত্র ‘শিমু’-এর কাজ। চিত্রনাট্যের জন্য রুবাইয়াত হোসেন জিতে নেন আর্টে ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার। টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর ছবিটি প্রদর্শিত হয় ৬৩তম বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে ছবিটি। ফ্রান্সের সেইন্ট জঁ দ্য-লুজ চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে নেন রিকিতা নন্দিনী শিমু। ইতালির টোরিনো বা তুরিন চলচ্চিত্র উৎসবে পেয়েছে ইন্টারফেদি পুরস্কার এবং ফ্রান্সের এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিতে নিয়েছে সেরা দর্শক পুরস্কার, জুরি পুরস্কারসহ ৩টি পুরস্কার। ২০১৯-এর ডিসেম্বরে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, কানাডা ও পর্তুগালের বিভিন্ন সিনেমা হলে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় ছবিটি। এরপর ২০২০ আমেরিকার বিভিন্ন হলে প্রদর্শনের পর ছবিটির বাণিজ্যিকভাবে দেখানো হয় মেক্সিকো, চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও জার্মানির সিনেমা হলে। আর মার্চে বাংলাদেশে মুক্তির পরপরই এপ্রিলে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে জাপানের বিভিন্ন সিনেমা হলে। প্রথম ছবি ‘মেহেরজান’ (২০১১) এবং দ্বিতীয় ছবি ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ (২০১৫)-এর পর ‘শিমু’ রুবাইয়াত হোসেনের তৃতীয় ছবি।