মাথায় বাংলাদেশের পতাকা, আর গায়ের পোশাকে লেখা অ আ ক খ। চাচার সঙ্গে প্রথমবার বইমেলায় এসেছে কিশোরগঞ্জের সামিয়া। এর আগে সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়েছিল ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। সামিয়ার চাচা ফিরোজ আলম বলেন, ‘কিছুদিন আগে পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার সময় ভাতিজিকে কথা দিয়েছিলাম, ভালো ফলাফল করতে পারলে ওকে ঢাকায় ঘুরতে নিয়ে যাব। এবার ভাতিজিকে শহীদ মিনার ও বইমেলায় নিয়ে এসেছি। বইও কিনে দিয়েছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে এসেছেন স্বপন মিয়া। এলাকায় নিজের বাড়িতেই ‘গুঞ্জন’ নামে একটি পাঠাগার পরিচালনা করেন তিনি। পাশাপাশি কবিতা ও ছড়া লেখার চর্চা করেন। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন তাকে পাওয়া গেল বইমেলার জাগৃতির স্টলের সামনে। স্বপন বলেন, “প্রতি বছরই বইয়ের প্রতি ভালো লাগার কারণে মেলায় আসা হয়। এবার মেলায় আমার নতুন বই ‘ভুল মিছিল ভুল ভালোবাসা’ প্রকাশ করেছে জাগৃতি। মেলায় কয়েকজন ক্রেতাকে নিজের বইয়ে অটোগ্রাফও দিয়েছি।”
একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সকাল থেকেই লোকসমাগম বাড়তে থাকে মেলায়। লাখো মানুষের জনস্রোত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে যেন এসে মিশে যায় বইমেলায়। এদিন সকাল ৮টা থেকেই খুলে দেওয়া হয় মেলার প্রবেশদ্বার। বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বই বিক্রিও বেড়েছে। তবে মেলার অব্যবস্থাপনার কারণে কিছুটা ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছে মেলায় আসা দর্শনার্থীদের। টিএসসি দিয়ে বইমেলায় প্রবেশদ্বারের পাশেই সরু একটি মাত্র পথ রাখা হয়েছে বের হওয়ার জন্য। আর সেই পথ ধরে মেলা থেকে বের হতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে দর্শনার্থীদের। এছাড়া শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজের জন্য সরুপথে যানজটে হাঁটতে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে মেলায় আসা দর্শনার্থীদের। তবুও সব ভোগান্তি ভুলে লক্ষাধিক মানুষ মিলেছিল প্রাণের মেলায়।
গতকাল সোমবার ছিল বইমেলার ৭ম দিন। এদিন মেলা চলে সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বইমেলায় এদিন নতুন বই এসেছে ২২৪টি।
ভাষাশহীদ মুক্তমঞ্চ
এদিন সকাল ৮টায় ভাষাশহীদ মুক্তমঞ্চে শুরু হয় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ। স্বরচিত কবিতাপাঠে অংশ নেন অর্ধশতাধিক কবি। সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা। বিকেল ৩টায় এই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিকণ্ঠে একুশে কবিতাপাঠ। স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন পঁচিশজন কবি। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সচিব এ এইচ এম লোকমান। বিকেল ৪টায় প্রদর্শিত হয় শহীদ জহির রায়হান পরিচালিত ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’।
‘লেখক বলছি’ মঞ্চ
এছাড়া গতকাল ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন ইমদাদুল হক মিলন ও আনিসুল হক।
মূলমঞ্চ
মেলার মূলমঞ্চে বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতা ২০২২। স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। ফিরে দেখা : আমাদের ভাষা আন্দোলন শীর্ষক অমর একুশে বক্তৃতা ২০২২ দেন কবি আসাদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, আমাদের একুশ এখন সারা বিশ্বের। একুশের সত্তর বছর আমাদের জাতিসত্তার উৎসমূলে নতুন করে দৃষ্টিপাত এবং ভাষা-সংস্কৃতি ও জাতিতাত্ত্বিক নিবিড় আত্মঅন্বেষায় উদ্বুদ্ধ করে।
কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, অমর একুশের সত্তর বছর পূর্ণ হলো। তবে বাঙালির ভাষা আন্দোলন কেবল সত্তর বছরের বিষয় নয়; হাজার বছর ধরে বাঙালি আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারের জন্য লড়াই করে এসেছে। এ লড়াই কেবল সাংস্কৃতিক লড়াই ছিল না, এ লড়াই ছিল অর্থনৈতিক-সামাজিক এবং অবশ্যই রাজনৈতিক। ভাষা আন্দোলনের মূলে ছিল পূর্ববাংলার সংগ্রামী জনগণের লড়াকু ভূমিকা। তারা এ আন্দোলনকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিণতিতে নিয়ে গেছে এবং কালক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কে আসন্ন করেছে।
সভাপতির বক্তব্যে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, অমর একুশের সত্তর বছর পূর্তি বাঙালি জাতির জন্য পরম গৌরবের বিষয়। ভাষাসংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মাকিদ হায়দার, বিমল গুহ ও আবদুস সামাদ ফারুক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী দেওয়ান সাইদুল হাসান, জয়ন্ত রায়, শাহাদৎ হোসেন নিপু। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয় ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। নৃত্য পরিবেশন করেন সৌন্দর্য প্রিয়দর্শিনী ঝুম্পা ও ফরহাদ আহমেদ শামীম। সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব চন্দ্র ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, স্বর্ণময়ী মণ্ডল, তাজুল ইমাম ও আরিফ রহমান। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ পাল (তবলা), আনোয়ার সাহদাত রবিন (কি-বোর্ড), মো. আরিফ কোরাইশী (গিটার), মো. ফারুক (অক্টোপ্যাড)।
আজ মঙ্গলবার বইমেলার আয়োজন
আজ মঙ্গলবার বইমেলার ৮ম দিন। মেলা চলবে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ : লেখক বঙ্গবন্ধু শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহাম্মদ সেলিম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ঝর্ণা রহমান ও তানভীর আহমেদ সিডনী। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।