আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান

টানা তিন মেয়াদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের এই শাসনামলে দেশে অনেক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এমনকি করোনাকালেও অর্থনীতির অনেক সূচকই চাঙ্গা রয়েছে। সমালোচক এমনকি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী অনেক নেতাই মনে করেন সরকার যেভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে, সেভাবে আওয়ামী লীগের ইমেজের উন্নয়ন ঘটছে না। তারা বলছেন, এক শ্রেণির নেতার দুর্নীতি এবং দলীয় স্বার্থ পরিপন্থী কর্মকান্ডের কারণে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন  হচ্ছে। জনগণের সামনে সরকার এবং আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি দেশজুড়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত এবং দলের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে যে মাত্রায় সংঘাত-সহিংসতা দেখা গেছে সেটাও ভীতিকর। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরে একটা বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, কেবল দলীয় শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তির প্রশ্নই নয়, আদর্শিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠাও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এই শুদ্ধি অভিযানে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন এবং সাংগঠনিকভাবে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে এরকম শুদ্ধি অভিযান ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বটে। কিন্তু এই অভিযান কতটা বিস্তৃত হবে এবং লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল হবে তার ওপরই নির্ভর করছে এর সাফল্য।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘কাটা পড়ছেন বিতর্কিতরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের এই শুদ্ধি অভিযানের নানা দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া দলীয় এমপি বা সংসদ সদস্যরাই এই অভিযানের বড় টার্গেট। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দলের পদ-পদবি পাওয়ার পাশাপাশি এমপি হয়েছেন, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা দুর্বল করে ব্যক্তি রাজনীতি চাঙ্গা করেছেন এমন অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, বিতর্কিত এসব এমপিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নও দেওয়া হবে না। খেয়াল করা দরকার, দেশের অন্তত ২৯ জেলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দলীয় এমপিরাই। এর মধ্যে দুই ডজন জেলার দলীয় পদে থাকা এমপিরা দলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে আট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এই জেলাগুলোর দায়িত্বে থাকা এমপিদের কাছ থেকে দলীয় পদ কেড়ে নেওয়া হবে বলে কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া তিন ডজন উপজেলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের পদে আছেন দলের এমপিরা। তাদেরও বেশিরভাগই দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে বিতর্কিত। এসব এমপিকেও দলীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান কেন্দ্রীয় নেতারা।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকা-ে এমন বেশকিছু ঘটনা ঘটেছেযা দেখে দলের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার বিষয়টি স্পষ্টতই দৃশ্যমান। সম্প্রতি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীকে দলীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ঢাকার এমপি হাজী সেলিমকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয় বিতর্কের জন্ম দেওয়ার কারণে। আর সর্বশেষ গত রবিবার অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুলকে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরানো হয়। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কঠোর অবস্থানের জানান দিচ্ছেন বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাদের বিরুদ্ধেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে, তাদের আমরা দলীয় পদে রাখছি না। নাটোরের শিমুল দুঃসময়ের কর্মী হলেও এমপি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। এজন্যই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় দৃশ্যত এটা বোঝা যাচ্ছে যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চলতি ২০২২ সাল এবং আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে দল গোছানের কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা বলছেন, এই ধারাবাহিকতাতেই কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরের মধ্য দিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করা হবে। এই উপলব্ধি জরুরি যে, রাজনীতি শুদ্ধ করতে না পারলে দল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও দলের ভাবমূর্তি ঠিক থাকবে না। এর আগে যুবলীগ ও ছাত্রলীগে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনাতে দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু খোলনলচে না পাল্টালে, দীর্ঘদিনের কলুষে মরচে ধরা শুদ্ধ রাজনীতির বিকল কলে শুদ্ধি অভিযান সফল হবে কি?