পারিবারিক কলহের কারণে নিজ ইচ্ছায় পাঁচ বছর আগে আত্মগোপনে চলে যান মেহেরপুরের রাকিবুজ্জামান রিপন। অন্যদিকে ছেলের খোঁজ না পেয়ে পুত্রবধূ ও তার বাবার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা করে রিপনের বাবা। পুলিশ তদন্তে নেমে মামলার কূলকিনারা করতে না পারলেও আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। আদালত অবশ্য পুলিশের সেই চার্জশিট গ্রহণ না করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কুষ্টিয়া কার্যালয়কে মামলার তদন্তভার দেয়। তদন্তে নেমে ‘খুন-গুম হওয়া’ সেই রিপনকে পাঁচ বছর পর গাজীপুর থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে গতকাল মঙ্গলবার মেহেরপুরের আদালতে হাজির করেছে পিবিআই।
এদিকে নিখোঁজ ছেলে রিপনকে ফিরে পেয়ে গতকাল আদালতের বারান্দায় তার মা-বাবাকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। অন্যদিকে স্বামী হত্যার মিথ্যা অভিযোগ মাথায় নিয়ে পাঁচ বছর ধরে শিশুসন্তান নিয়ে হয়রানির শিকার রিপনের স্ত্রী শ্যামলী খাতুন করছিলেন আর্তনাদ। আনন্দ-বেদনার এমন বিপরীত দৃশ্য দেখতে এ সময় আদালত চত্বরে ভিড় করেন বহু মানুষ।
কথিত ‘হত্যা-গুমের’ শিকার রাকিবুজ্জামান রিপন জানান, তার বাবার নাম মনিরুল ইসলাম। বাড়ি মেহেরপুর শহরের উপকণ্ঠে গোভীপুর গ্রামের দত্তপাড়ায়। ২৫ বছর বয়সে নিজের পছন্দে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা শহরের শিশিরপাড়ার শ্যামলী খাতুনের সঙ্গে বিয়ে হয়। সেখানে ঘর জামাই থাকা অবস্থায় তাদের সংসারে ছেলে সন্তান জন্ম নিলে দেখা দেয় পারিবারিক কলহ। এমন পরিস্থিতিতে কাউকে কিছু না বলে গাজীপুরে চলে যান রিপন।
ছেলেকে ফিরে পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রিপনের বাবা মনিরুল ইসলাম গতকাল আদালত চত্বরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছেলের খোঁজ না পেয়ে তাকে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ এনে পুত্রবধূ শ্যামলী খাতুন ও তার মা, বাবা, চাচাকে আসামি করে আদালতে হত্যা মামলা করেন। এখন ছেলেকে কাছে পেয়ে তারা খুশি।
অন্যদিকে রিপনের স্ত্রী শ্যামলী খাতুন স্বামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করে বলেন, ‘নগদ সোনা ও টাকা যৌতুক দিয়ে আমার মা-বাবা রিপনের সঙ্গে বিয়ে দেয়। রিপন ভালো ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ছিল। আয়ও করত ভালো। কিন্তু মেয়ে ও মাদকে আসক্তি থাকায় আয় করা অর্থ খারাপ কাজে ব্যয় করত। পুনরায় যৌতুক দিতে না পারায় ছয় মাসের শিশুকে ফেলে কাউকে কিছু না বলে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে সে নিরুদ্দেশ হয়। অথচ আমার ও আমার পরিবারের নামে হত্যা মামলা করে শ্বশুর।’
শ্যামলী খাতুন আরও বলেন, ‘জন্মের পর ছেলে পিতৃত্বের পরিচয় বা ভালোবাসা পেল না। অথচ পিতা হত্যার মিথ্যা অভিযোগ মাথায় নিয়ে থানা, পুলিশ, কোর্টে ঘুরতে হয়েছে পাঁচ বছর। আমি স্বামী চাই না। সন্তানের ভরণপোষণ আর ক্ষতিপূরণ চাই।’
রিপনকে ‘খুন-গুমের’ অভিযোগে করা মামলাটির তদন্ত করেন কুষ্টিয়া পিবিআইর কর্মকর্তা মোঃ শহীদ আবু সরোয়ার। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, আদালত দুই দফা পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট নাকচ করে পিবিআই কুষ্টিয়াকে মামলার তদন্তভার দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা নিখোঁজ রিপনের সন্ধান পান। নাম-পরিচয়, জন্মতারিখ পরিবর্তন করে শরিফুল ইসলাম নাম ধারণ করে গাজীপুরে চাকরি নেন রিপন। সেখানে শিমলা আক্তার (২০) নামে এক নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসারও শুরু করেন। সেই সংসারেও জন্ম নেয় একটি সন্তান। গাজীপুরের ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেডের ইলেকট্রিক্যাল মিস্ত্রি পদে চাকরিরত রিপনকে পিবিআইর একটি দল গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আটক করে কুষ্টিয়ায় আনে। রিপন সব ঘটনা স্বীকার করলে গতকাল তাকে মেহেরপুরের জজ আদালতে হাজির করা হয়।