গতকাল আজিমপুর কবরস্থানে চিরঘুমে চলে গেলেন প্রখ্যাত গীতিকবি কাওসার আহমেদ চৌধুরী। তিনি একাধারে কবি, লেখক, গীতিকার, চিত্রশিল্পী, জ্যোতিষী এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার লেখা গান গেয়েছেন ফেরদৌসী রহমান, মাহমুদুন্নবী, নীলুফার ইয়াসমীন, সাবিনা ইয়াসমীন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, লাকী আখন্দ, হ্যাপি আখন্দ, ফেরদৌস ওয়াহিদ, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, সুবীর নন্দী, আবিদা সুলতানা, সুমনা হক, শুভ্র দেব, প্রবাল চৌধুরী অন্যতম। তার লেখা জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘যেখানে সীমান্ত তোমার সেখানে বসন্ত আমার’, ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়’, ‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না’, ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে’, ‘মৌসুমী কারে ভালোবাসো তুমি’, ‘একঝাঁক প্রজাপতি ছিলাম আমরা’, ‘স্বাধীনতা, তোমাকে নিয়ে গান তো লিখেছি’ প্রভৃতি।
কেউ তাকে দেখতে পর্যন্ত আসেননি
সামিনা চৌধুরী, সংগীতশিল্পী
কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা গানের মান, আধুনিক গানে তার অবদান এসব নিয়ে আমি নতুন করে আর কিছু বলতে চাই না। সারা বিশে্ব তার গানের অজস্র শ্রোতা আছেন। তারাই তাকে মূল্যায়ন করেছেন। তার অনেক গান হয়েছে কালজয়ী। আমি বরং তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে বলি। তার গানের কথা যেমন ছিল আধুনিক, তেমনি তিনি রুচি, মনন ও জীবনযাপনে ছিলেন আধুনিক। নিজের একটা আলাদা স্টাইল ছিল, গানেও তাই। তবে মানুষটি ছিলেন বড্ড সরল। কাউকে ভালো লাগলে তার সঙ্গে একেবারেই বন্ধুর মতো মিশতেন। আর ভালো না লাগলে কথাও বলতেন না। এ রকম মানুষ কখনো প্রচার চান না নিজের। তারা চান, তার মেধাকে মূল্যায়ন করেই তাকে দিয়ে কাজ করানো হোক, সম্মাননা দেওয়া হোক কিংবা তাকে নিয়ে কথা বলা হোক। তার সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক। তাকে মামা বলে ডাকতাম। তার লেখা গানে প্রথম কণ্ঠ দিই ছোটদের অনুষ্ঠান ‘সাতটি রঙে সাতটি সুর’-এ। এরপর ১৯৮৫ সালে বিটিভির ‘কথা ও সুর’ অনুষ্ঠানে। সেখানে একজন গীতিকারের দশটি গান সুর করতেন একজন সুরকার। আর দুটি করে গান গাইতেন পাঁচজন শিল্পী। সেই অনুষ্ঠানে কাওসার মামার লেখা ১০টি গানের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছিলেন লাকী আখন্দ। গেয়েছিলাম আমি, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, ফেরদৌস ওয়াহিদ, হ্যাপী আখন্দ ও লাকী আখন্দ নিজে। আমার গান দুটি ‘কবিতা পড়ার প্রহর’ ও ‘আমায় ডেকো না’ এখনো মানুষের সমান প্রিয়। এই অনুষ্ঠানেই নিয়াজ চাচার গাওয়া ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না’ কালজয়ী হয়েছে। হ্যাপী আখন্দের ‘নীল নীল শাড়ি পরে’ সে সময় তুমুল জনপ্রিয় হয়। ফেরদৌস ওয়াহিদ গেয়েছিলেন ‘পলাতক সময়ের হাত ধরে’ গানটি। এই গান তার আগে আমার বড় বোন ফাহমিদা নবী গেয়েছিলেন। তার লেখা আরেকটি বিখ্যাত গান ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে দারুণ জনপ্রিয় হয়। সেই গানও ১৯৭৮ সালে ফাহমিদা নবী আগে গেয়েছিলেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তার সঙ্গে আমাদের পরিবারের সুসম্পর্ক। কিন্তু খুব খারাপ লেগেছে, যখন দেখেছি এত বড়মাপের একজন গীতিকার অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, কিন্তু গানের জগতের কেউ তার খোঁজখবর নেননি। এমনকি তাকে শেষ দেখাও দেখতে আসেননি। আমরা ভারতের সবকিছু নকল করি। কিন্তু তারা যেভাবে গুণীর কদর করেন, সেটা আমরা শিখতে পারি না কেন? যে দেশে এভাবে গুণীরা অবহেলিত হয়ে চলে যান, সে দেশে আর কি গুণীর জন্ম হবে? এই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।
আধুনিক গানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন
কুমার বিশ্বজিৎ, সংগীতশিল্পী
বরেণ্য আজ আমাদের মধ্যে নেই। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। কাওসার ভাইয়ের লেখনী নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা গানে তার অবদান অনস্বীকার্য। যে কজন গীতিকবি তাদের গানগুলোর মাধ্যমে কাব্য, সাহিত্য, অন্ত্যমিলে বাংলা আধুনিক গানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, অন্য মাত্রা দিয়েছেন তাদের মধ্যে কাওসার ভাই অন্যতম। তার গানে আমরা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। তার গানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে আকর্ষণ করা গেছে। তার গানের মাধ্যমে অনেকে ভেসেছেন আবেগে, অনুভূতিতে, বেদনায়, অনেকে সাহস পেয়েছেন, শক্তি পেয়েছেন। আমরা সত্যিকার অর্থে তার কাছে ঋণী। একটা জিনিস নিয়ে আমি হতাশায় ভোগী। তার মতো মহিরুহদের চলে যাওয়ায় যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে তা পূরণের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। আদৌ কি পূরণ হবে? মানুষ মরণশীল, সবাইকে এক দিন চলে যেতে হবে। তবে আমি অনেক ভাগ্যবান যে তার মতো মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। তার লেখা কালজয়ী গান ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। এজন্য আমি তার আছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। একজন শিল্পীর জীবনে এ ধরনের গান পাওয়ার চেয়ে আর বড় কিছু হতে পারে না। আমি আবারও কাওসার ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি।