সাড়ে ৪ কোটি টাকা লুট

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ইউনিয়ন সমাজকর্মীর (স্থায়ী রাজস্ব) ৪৩৫টি পদে নিয়োগের জন্য অধিদপ্তরেরই একটি সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্তে উঠে এসেছে। যদিও এসব পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে গত বছর ২৩ ডিসেম্বর পরীক্ষার ঠিক আগের দিন স্থগিত করা হয়েছে। ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে চাকরি দেওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলার চাকরিপ্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত একটি তালিকা করেছিল নিয়োগ সিন্ডিকেট। সেই তালিকা ধরে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে টোকেন মানি হিসাবে ১ লাখ টাকা করে জমা নেন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এভাবে বাছাই করা ৪৩৫ চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছিল নিয়োগবাণিজ্য চক্র। আর নিয়োগ চূড়ান্ত হলে নিয়োগপ্রার্থীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে আরও ১৫ লাখ টাকা করে নেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। চাকরি নিশ্চিত হলে সব মিলিয়ে ঘুষের অঙ্ক দাঁড়াত প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগবাণিজ্য চক্রের ছয় সদস্যকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চক্রটির একাধিক সদস্যকে। যাদের কাছ থেকে নিয়োগবাণিজ্যের বেশ কিছু আলামত উদ্ধারসহ ৫৭ লাখ টাকা জব্দ করেছে ডিবি। এ ঘটনায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় ডিবির পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নিয়োগবাণিজ্যে সম্পৃক্তরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়ায় তাদের সরাসরি গ্রেপ্তার না করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এরপর বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে দুদক। একই সঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগবাণিজ্য সিন্ডিকেটের ডজনখানেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারিতে রেখেছে গোয়েন্দারা। গত কয়েক দিন ধরে তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তা, আদালত সূত্র ও দুদকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগবাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার দুজনকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে নিয়োগবাণিজ্যের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি অধিদপ্তর কিংবা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া (সাময়িক বরখাস্ত হওয়া) দুজনের কাছ থেকে নিয়োগবাণিজ্যে জড়িত যেসব ব্যক্তির তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের বিষয়েও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি অধিদপ্তর।

নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের কারণ জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ও নিয়োগ কমিটির সভাপতি সৈয়দ মো. নূরুল বাসির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। তারা চিঠি দিয়ে “অনিবার্য কারণ” উল্লেখ করে বন্ধ করে দিয়েছে।’

নিয়োগবাণিজ্যের কারণে এটা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা হতে পারে। তবে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কাছে এ বিষয়ে কেউ কোনো কমপ্লেইন করেনি। যদিও আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে তদবিরবাজ বা দালালদের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছি।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে নিয়োগ কমিটির সভাপতি, যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এ কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিবি তাদের মতো করে তদন্ত করছে। এটা নিয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ বা নিজস্ব কোনো তদন্ত হচ্ছে না। কারণ এটা নিয়ে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি পাওয়া যায়নি, যার অভিযোগের আলোকে তদন্ত হতে পারে। তাছাড়া ডিবি যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তাদের বিষয়ে ডিজি স্যার অ্যাকশন নিয়েছেন। তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে।’

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, একজন চাকরিপ্রার্থীর তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ওয়ারী জোনাল টিমের কর্মকর্তারা তদন্তে নামেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের হাতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগবাণিজ্য সিন্ডিকেটের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য আসতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় অভিযান চালিয়ে অধিদপ্তরের কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় চাকরিপ্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা। যেখানে দেশের বিভিন্ন জেলার অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট সদস্যদের বাছাই করা চাকরিপ্রার্থীদের নাম ছিল। যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে ন্যূনতম ১ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে ডিবির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিবির অভিযানের পর নিয়োগবাণিজ্যে সম্পৃক্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে ছুটি নিয়ে অফিসে যাননি। আবার কেউ কেউ কৌশলে ডিবির মামলা কিংবা জিডির সাক্ষী সেজে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় করা জিডিতে যাদের টাকা উদ্ধারের ঘটনায় সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তারা হলেন গোলকচন্দ্র সরকার ও যোগেশ চন্দ্র ভৌমিক। তবে অধিদপ্তরের কর্মচারী যোগেশ চন্দ্র ভৌমিক দেশ রূপান্তরের প্রশ্নের জবাবে শেরেবাংলা নগর থানায় করা জিডির সাক্ষী হিসেবে নিজের থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘এ ঘটনার আমি কিছুই জানি না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সাক্ষী নিয়োগবাণিজ্যের বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধিদপ্তরের অন্তত ডজনখানেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা সরাসরি শীর্ষ কর্মকর্তার আস্থাভাজন, তাদের মাধ্যমেই সারা দেশ থেকে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে থেকে ৪৩৫ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়। এ কাজের মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ সমাজসেবা কর্মচারী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক। যিনি মাঠপর্যায় থেকে চাকরিপ্রার্থী শনাক্ত ও টাকা নেওয়ার কাজে সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে। এছাড়া গ্রেপ্তার হয়েছেন মাহমুদুল হাসান ওরফে সেলিম নামে আরও এক কর্মচারী নেতা। পলাতক আছেন আরও একাধিক ব্যক্তি।

নিয়োগবাণিজ্যের আলামত ও টাকা উদ্ধারের ঘটনায় গত বছর ২৪ ডিসেম্বর শেরেবাংলা নগর থানায় করা জিডিতে (জিডি নং-১৫৪২) বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সমাজসেবা কর্মচারী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক নিয়োগবাণিজ্যের হোতা। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন মো. মাহমুদুল হাসান ওরফে সেলিম ও মো. ফারুক নামে আরও দুই ব্যক্তি। এ তিনজনের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও ফারুক পলাতক। যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের কাছ থেকে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া ৫৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পরবর্তীকালে তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী আরও একাধিক ব্যক্তির কম্পিউটার দেখে প্রার্থীদের শর্টলিস্ট উদ্ধার করা হয়েছে। তারপর পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রাথমিক তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন যে দেশের বিভিন্ন জেলায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালকের তত্ত্বাবধানে নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করে তারপর সেই তালিকা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তারপর ঢাকা থেকে টাকার বিনিময়ে সব পদের নিয়োগ চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল এ সিন্ডিকেট। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের তদবিরের তালিকাও তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। যে তালিকায় অন্তত ২০ জনের নাম ছিল। প্রাথমিকভাবে এসব প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা নেওয়া হলেও চাকরি নিশ্চিত হলে ঘুষের অঙ্ক দাঁড়াত শতকোটি টাকার কাছাকাছি।

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘লেনদেন হওয়া প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার মধ্যে ৫৭ লাখ টাকা উদ্ধার হওয়ার পর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া বাকি টাকা উদ্ধার ও নিয়োগবাণিজ্যে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধানে নেমেছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ শাখার কর্মকর্তা আরিফ সাদেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য বেশ কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সেসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সঠিক হবে না।’

শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সামনের রাস্তার ওপর থেকে মো. মাহমুদুল হাসান ওরফে সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার দেহ তল্লাশি করে কাঁধে থাকা কালো রঙের একটি ব্যাগে এক হাজার টাকার নোটের ২১টি বান্ডিল পাওয়া যায়, যার প্রতি বান্ডিলে ১০০ পিস করে ২১ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এছাড়া তার কাছ থেকে একটি আইফোন ও একটি নোকিয়া বাটন মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে গোলাম ফারুকের দেহ তল্লাশি করে তার কাছে থাকা কালো রঙের ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার নোটের ৭২টি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়, যার প্রতি বান্ডিলে ১০০ পিস করে মোট ৩৬ লাখ টাকা ছিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানান, গত ২৪ ডিসেম্বর সমাজসেবা অধিদপ্তরের ইউনিয়ন সমাজসেবা কর্মী নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ক্রমিক নং, নাম, রোল, জেলার নাম ও পরীক্ষা কেন্দ্রের নাম সংবলিত কম্পিউটার কম্পোজ করা ৫৯ পাতার বেশ কিছু নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। এসব কাগজপত্রে চার শতাধিক পরীক্ষার্থীর তথ্য ছিল, যাদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা নিয়েছে নিয়োগ চূড়ান্ত করার কথা বলে। তবে ২৩ ডিসেম্বর পরীক্ষার ঠিক আগের দিন বৃহস্পতিবার পরীক্ষা স্থগিতের নোটিস দেওয়া হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ও বিভাগীয় নিয়োগ কমিটির সভাপতি সৈয়দ মো. নূরুল বাসির স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে ‘অনিবার্য কারণে’ পরীক্ষা স্থগিতের কথা উল্লেখ করা হয়। যদিও ওই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে ততক্ষণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষার্থীরা ঢাকায় চলে এসেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগেও অধিদপ্তর নোটিস দিয়ে পরীক্ষা স্থগিত করেছিল। ২০১৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন সমাজকর্মী (স্থায়ী রাজস্ব) পদে নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। সেবারও অধিদপ্তর পরীক্ষার কয়েক দিন আগে ২৪ সেপ্টেম্বর স্থগিতের নোটিস দিয়েছিল। ওই পরীক্ষার আগেও নিয়োগ সিন্ডিকেটের কারসাজি ধরা পড়েছিল।