আজ শনিবার এক দিনে দেশের এক কোটি মানুষকে করোনার টিকার প্রথম ডোজ দেবে সরকার। এর মধ্য দিয়ে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল রবিবার থেকে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে প্রথম ডোজ দেওয়ার কাজ। চলবে দ্বিতীয় ও বুস্টার বা তৃতীয় ডোজ টিকা কর্মসূচি।
এ গণটিকাকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ ধরেই দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার চালানো হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ১৮ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী যেকোনো মানুষ নিবন্ধন ছাড়াই টিকা নিতে পারবেন। সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে চীনের সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাক টিকা দেওয়া হবে।
গণটিকার জন্য গ্রামাঞ্চলে ১৬ হাজারের বেশি ও শহরাঞ্চলে (পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) সাড়ে আট হাজার অস্থায়ী টিকাকেন্দ্র করা হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী সব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত বুথ ও ভ্যাক্সিনেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ৭০ হাজারের মতো ভ্যাক্সিনেটর ও স্বেচ্ছাসেবক টিকা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে, এ গণটিকার মধ্য দিয়েই লক্ষ্যমাত্রার ৭০ শতাংশ মানুষকে প্রথম ডোজ দিয়ে টিকার আওতায় আনতে পারবে। এরপর থেকে দ্বিতীয় ও বুস্টার ডোজ দেওয়ার কাজ চলবে। এভাবে আগামী এপ্রিলের মধ্যে এই ৭০ শতাংশ মানুষের সম্পূর্ণ টিকা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সার্বিক প্রস্তুতির ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার (আজ) যাতে ৭০ শতাংশ মানুষের টিকা শেষ হয়, আমরা সে পরিকল্পনা করেছি। প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখিনি। সকাল ৯টা থেকে টিকাদান শুরু হবে। কেন্দ্রে যতক্ষণ লোক থাকবে, টিকাদানও ততক্ষণ চলবে।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা টিকাকেন্দ্র অনেক বৃদ্ধি করেছি। বিশেষ করে যেসব জায়গায় টিকা নেওয়ার সংখ্যা কম, সেখানে কেন্দ্র আরেকটু বেশি করেছি। যেমন সিলেট বিভাগে ও নারায়ণগঞ্জে টিকা কিছুটা কম নিয়েছে মানুষ। এসব জায়গা আমরা ভিজিট করেছি। মানুষ যাতে টিকা নিতে যেতে পারে, সেজন্য লোকালয়ের কাছাকাছি কেন্দ্রগুলো করা হয়েছে। প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছি। মানুষ যাতে টিকা নিতে আসে, সেজন্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করেছি, কথা বলেছি। বিভিন্ন ফ্যাক্টরি, দোকান, মার্কেটে টিকা হয়নি, তাদেরও এ কর্মসূচির আওতায় এনেছি।
প্রথম ডোজের বাকি ১ কোটি ৭ লাখ : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২১ পর্যন্ত দেশের প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৭ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জনকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। তাদের মধ্যে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছে ১০ কোটি ৮৪ লাখ ৪৮ হাজার ৬১০ জন, যা লক্ষ্যমাত্রার জনসংখ্যার ৯১ শতাংশ। সে হিসাবে সেদিন পর্যন্ত টিকার বাকি ছিল ১ কোটি ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩৪৪ জন বা ৯ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ গতকাল শুক্রবার ও আজ মিলে এই ৯ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে।
আজ শনিবারের মধ্যে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে গত এক সপ্তাহ ধরেই টিকা নিতে দেশ জুড়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। বিশেষ করে ২৬ ফেব্রুয়ারির পর আর প্রথম ডোজ দেওয়া হবে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন তথ্যে গত কয়েক দিন ধরে টিকার প্রথম ডোজ নিতে কেন্দ্রগুলোতে বেশ ভিড় করে মানুষ। এ সময় ভিড় সামাল দিতে বিভিন্ন কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলাও হয়। ফলে বাধ্য হয়ে গতকাল শুক্রবারও টিকাকেন্দ্র খোলা রাখা হয় ও বিভিন্ন কেন্দ্রে টিকা নেয় মানুষ।
গণটিকার মাধ্যমে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে গত কয়েক দিনে টিকাদানেও বেশ গতি ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক দিনে যেখানে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছিল ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪৬২, সেখানে ২৪ ফেব্রুয়ারি সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪০ জনে। গতকালও টিকা নিয়েছে মানুষ, তবে রাত ৯টা পর্যন্ত এ তথ্য জানা যায়নি।
নিবন্ধন লাগবে না : আজ গণটিকা কর্মসূচি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর এবং কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আমরা গত কয়েক দিন ধরেই টিকায় গতি এনেছি। আগে যেখানে দিতাম তিন লাখ, সেখানে বৃহস্পতিবার ১৯ লাখের মতো টিকা দিয়েছি। ফলে শনিবারের গণটিকায় আশা করছি বাকি এক কোটি টিকা দিতে পারব।’
এ কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রত্যেক ওয়ার্ডে তিনের অধিক কেন্দ্র করা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটি জোনে ৩০টি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি জোনে ৪০টি, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে প্রতিটি জোনে ৬০টি করে এবং খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও রংপুরের প্রতিটি জোনে অতিরিক্ত ২৫টি করে ভ্রাম্যমাণ দল থাকবে। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলার দলগুলো ৩০০ এবং সিটি করপোরেশনের দলগুলো ৫০০ জন করে ব্যক্তিকে টিকা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘টিকা পেতে কোনোরকম নিবন্ধন লাগবে না। জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র কিছুই লাগবে না। আবার কেউ নিবন্ধন করে এলেও অসুবিধা নেই। সেদিন নিয়মিত টিকাকেন্দ্রগুলোতেও টিকা দেওয়া হবে। পর্যাপ্ত টিকার মজুদ আছে। প্রথম ডোজের টিকাকে একটা ধারায় আনতে ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ করা হবে। এরপর টিকার দ্বিতীয় ও বুস্টার ডোজ চলবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতি ওয়ার্ডে ৯টি করে মোট ৬৭৫টি টিকাকেন্দ্র করা হয়েছে। প্রতি কেন্দ্রে ৫০০ জন করে মোট ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
মজুদ ১০ কোটি টিকা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী টিকার অপ্রতুলতা সত্ত্বেও দেশের সরকার পর্যাপ্ত টিকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে দেশে ছয় প্রকারের (অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার, মডার্না, সিনোফার্ম, সিনোভ্যাক এবং জনসন অ্যান্ড জনসন) প্রায় ১০ কোটি ডোজ কভিড-১৯ টিকা মজুদ রয়েছে।
অধিদপ্তর জানায়, সরকার দেশের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, ভাসমান জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, পরিবহন ও কলকারখানাসহ সব স্তরের শ্রমিক, গর্ভবর্তী ও স্তন্যদানকারী নারী, স্কুল-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ সব বিশেষ জনগোষ্ঠীকে কভিড-১৯ টিকার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। কভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন একটি কার্যকর সমাধান। ভ্যাকসিন কভিড-১৯-জনিত মৃত্যুঝুঁকি কমায়। গবেষণা হতে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যারা অন্তত দুই ডোজ ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন তাদের অধিকাংশেরই আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয়নি।