গুগলে ‘সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা’ লিখে অনুসন্ধান বাটনে চাপ দিলেই আপনি রাশি রাশি লেখা পেয়ে যাবেন। এমনকি পেয়ে যাবেন পিআইবি প্রকাশনা থেকে ১৯৮৯ সালে মুদ্রিত ‘সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা’ নামের পুস্তকটিও। ১৯৮৮ সালে পিআইবির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেমিনারে ‘সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার’ নিয়ে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা করেছিলেন। এর সূত্র ধরেই আরও কিছু লেখা সংযুক্ত করে পরের বছর পুস্তকটি প্রকাশিত হয়। লিখিত সে বক্তৃতায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সাত খন্ডে বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে সংবাদপত্রগুলোতে ভাষা প্রয়োগে অনেক বিভ্রান্তি ও ভুল থেকে যায়।
সংবাদপত্রগুলোকে বিদেশি সংবাদের জন্য ইংরেজি ভাষার সংবাদসংস্থার ওপরে নির্ভর করতেই হয়। ফলে বাংলা ভাষায় সেসব সংবাদ প্রকাশের জন্য বিস্তর অনুবাদ করাটা আবশ্যিক কর্তব্য হয়ে ওঠে। উপরন্তু ঐতিহাসিক দায় হিসেবেই ইংরেজির বাক্যকাঠামো অনুকরণে বাংলা লেখার চর্চাও হয়ে আছে আমাদের মজ্জাগত। আর এ দুই কারণেই সংবাদপত্রের পাতায় ঘটতে থাকে নানা বিভ্রাট। ভুল বাক্যগঠন থেকে শুরু করে একেবারে অনর্থক বাক্যেরও দেখা মেলে পত্রিকার পাতায়, শিরোনামে যেমন তেমনই মূল সংবাদের শরীরেও। ‘পুলিশ আনার্থড এ স্পাই রিং’-এর এরকম বাংলা অনুবাদও পত্রিকার পাতায় আমাদের দেখতে হয়েছে যে, ‘পুলিশ মাটি খুঁড়ে একটি গোয়েন্দা আংটি বাহির করিল!’
তবে সমস্যা এখানেই সীমিত নয়। সংবাদপত্র দৈনন্দিনের ভাষাচর্চা করে, উপরন্তু এ চর্চা চলে দ্রুতগতিতে। প্রতিদিন পত্রিকাটি প্রকাশ করতেই হয়। সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার চেয়ে সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে তাড়াতাড়ি তথ্য জানানোর তাগিদ। এ কারণে অনেকে সাংবাদিকতাকে ‘তাড়াহুড়োর সাহিত্য’ও বলেন। আর তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভাব প্রকাশের জন্য যথাযথ শব্দপ্রয়োগ ও বাক্যবিন্যাসে ব্যত্যয় ঘটে, যার পরিণতি অনিবার্য অর্থবিপর্যয়। ভাষা-দক্ষতার অভাবে, ব্যাকরণে ব্যুৎপত্তির অভাবে, এমনকি অমনোযোগের কারণেও বটে, সাংবাদিকতা চর্চাকারীরা বিপুল ভুলভ্রান্তির জন্ম দেন। ‘রুটিবোঝাই ট্রাক লুট’ শিরোনামটি পড়ে আপনার মনে হতেই পারে যে খোদ ট্রাকটিই বুঝি লুট হয়ে গেছে, সাথে রুটিগুলোও। অথচ, পুরো সংবাদটি পড়ে আপনাকে বুঝতে হলো, ট্রাকটি নয় বরং ট্রাকটি থেকে রুটিগুলো লুট করে নেওয়া হয়েছে! পাঠক হিসেবে এ বিভ্রম নিশ্চয় প্রত্যাশিত নয়। অধিক আশঙ্কার কথা হলো, নবীন পাঠকরা এসব ভুলভালকেই সঠিক ভাষাবিন্যাস হিসেবে শিখতে থাকে।
বাংলা সংবাদপত্রগুলোর দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালে আপনারা দেখতে পাবেন, কেবল ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে সাধু ভাষার ধ্বজাটি তার ক্রিয়াবাচক কর্ম নিয়ে টিকে আছে। আর সব পত্রিকার সকল পরিসরে চলিত ভাষার চল হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ইত্তেফাকসহ আরও কয়েকটি পত্রিকা সাধু ভাষার চর্চা করলেও এখন সে ভাষাভঙ্গির নিশানা ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় স্তম্ভ বাদে আর কোথাও দেখা যাবে না। তবু, ইতিহাসের এ উত্তরাধিকার কে অস্বীকার করবে! ফলে, গুরুচ-ালী দোষ আমাদের সকল পত্রিকাতেই আকছার ঘটে চলেছে। যেমন ‘বাজারে চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে’ বাক্যটিই ধরা যাক। তৎসম শব্দগুলো পরিহার করে সহজ সাবলীলভাবেও কথাগুলো এইভাবে বলা যেতে পারত: ‘বাজারে চালের দাম বেড়েছে’! অথচ এই সরলতার বোধটুকুও অধিকাংশ সংবাদকর্মীর মননে অনুপস্থিত।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভূরিভূরি উদাহরণ টেনে এ রকম নানা অসঙ্গতির চিত্র আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। ওই প্রকাশনায় সন্তোষ গুপ্তের লেখাটিতেও ভূরিভূরি উদাহরণ টেনে এ রকম বিচিত্র সব ভুল আর অসঙ্গতি দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে যারা লিখেছেন তাদের লেখাগুলোতেও সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারে বহুবিধ ‘নৈরাজ্য’র চিত্র উঠে এসেছে। এগুলো জরুরি কাজ। এমনকি লেখাগুলোতে এরকম এক আফসোসও দেখা যায় যে, অতীতে সাহিত্যরসসমৃদ্ধ ও শুদ্ধ ভাষায় সাংবাদিকতাচর্চার প্রচেষ্টা থাকলেও আজকাল তা বিরল হয়ে উঠেছে। ফলে অতীতচারিতার পাশাপাশি, একটা মান বাংলায় সংবাদিকতাচর্চা করতে হবে, এরকম প্রত্যাশা এ সকল লেখার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তবে এর পাশাপাশি ইদানীং আরও এক উদ্বেগ প্রকটিত হয়ে উঠেছে। ‘ভুঁইফোঁড়’ নিউজপোর্টাল তো বটেই, রেডিও আর টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অনেক সঞ্চালক ও অংশগ্রহীতা বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে এমন এক খিচুড়ি ভাষাতে কথা বলেন এবং এমন এক উচ্চারণভঙ্গি অনুসরণ করেন যে মনে হতেই পারে, আমরা বাংলা নয় বিদেশি কোনো ভাষা শুনছি! ফলে, গেল গেল এক রব ধ্বনিত এবং প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সর্বত্র।
সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার চর্চা নিয়ে এই যে বহুবিধ উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, তা আমলে নেওয়া আমাদের দরকার। ভাষার বোধগম্যতার দিক থেকে যেমন, তেমনই জনরুচি নির্মাণের কর্তব্যের দিক থেকেও। তবে একথাও বলা দরকার, এতকাল সংবাদপত্রের ভাষাকে বিচার করা হয়েছে মূলত বৈয়াকরণিকের দৃষ্টিকোণ থেকে। এ বিচার বহিরঙ্গের। ভাষাকে কেবল ভাবপ্রকাশের ‘বাহন’ ভাবা হয়েছে। ফলে, যখন সে বাহনের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে তা মেরামতের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে, যেমন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান দিয়েছেন। কিন্তু ভাষার অন্তরঙ্গ পরিসর নিয়ে আলাপ বিশেষ চোখে পড়ে না।
সাত খ- রামায়ণ পড়ে কেউ যদি বলে যে, ‘সীতা রামের মাসী’ তাহলে বিপুল হাস্যরসেরই উদ্রেক হয়। কিন্তু অনেক সময় করুণ রসের আবির্ভাবও অপ্রত্যাশিত নয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার লেখার প্রথম খ-ে উল্লেখ করেছেন বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের আঁতুড় ঘরের খবর। মুদ্রণ যন্ত্র কলকাতায় আগেই বসেছিল, আর অগাস্টাস হিকির সম্পাদনায় ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজদের জন্য ইংরেজি ভাষায়, যা ‘হিকির গেজেট’ নামেই পরিচিত। কিন্তু বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশে পেরিয়ে গিয়েছিল আরও অনেকগুলো বছর। ১৮১৮ সালের কলকাতায় গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় বেঙ্গল গেজেট নামের প্রথম বাংলা পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। অল্পদিনের ব্যবধানেই বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল দিগদর্শন এবং তারপরে বাংলা ভাষায় সাময়িকপত্র প্রকাশের বান ডেকেছিল। আনিসুজ্জামান উল্লেখ করেছেন, ‘১৮০১ থেকে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে প্রকাশিত বাংলা বই যা সাধন করতে পারেনি, ১৮১৮-১৮৩৫ এর মধ্যে বাংলা সাময়িকপত্র তা পেরেছিল।’ কী সাধন করতে পেরেছিল? ইতিহাসবিদ সুকুমার সেনকে উদ্ধৃত করে তিনি জানাচ্ছেন, প্রতিদিনের কাজকর্ম ও সর্বসাধারণের উপভোগ্য এক সাবলীল বাংলা ভাষার জন্ম দিতে পেরেছিল।
তবে এটুকু বললেই যথেষ্ট হয় না। উনিশ শতকের কলকাতায় সংবাদ-সাময়িকপত্রগুলো কেবল প্রতিদিনের কাজকর্মের উপযোগী ও রসসঞ্চারী এক সাবলীল বাংলা ভাষারই জন্ম দেয়নি, জনপরিসরে এক নবজাগরণও সম্ভব করে তুলেছিল। কারণ তখন ভাষার প্রশ্নটি আত্মসত্তার প্রশ্ন থেকে আলাদা ছিল না এবং সংবাদ-সাময়িকপত্রগুলো তা অনুসন্ধানে নিমগ্ন হয়েছিল। করুণ রসের উদ্রেক এ কারণেই হয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা সে রকম কোনো জাগরণের আন্দোলন অনুভব করতে পারিনি। এর প্রধান কারণ মনে হয় কিঞ্চিত নিহিত আছে সংবাদপত্রের ভাষার বহিরঙ্গ নিয়ে অতিমনোযোগ এবং বিপরীতে অন্তরঙ্গ পরিসর নিয়ে অমনোযোগের ভেতরে। উনিশ শতকের কলকাতার অনুকরণ করতে গিয়ে ভাষার শুদ্ধতার দিকে আমরা অধিক মনোযোগী হয়ে উঠলেও, ভাষায় নতুন আত্মা নির্মাণের দিকে বিশেষ মনোযোগী হতে পারিনি। সংস্কৃত ব্যাকরণ ও শব্দসম্ভার এবং সেইসঙ্গে ইংরেজি ব্যাকরণের মিশ্রণে যে বাংলা ভাষার চর্চা চালু হয়েছিল, সংবাদপত্রের বেলায় আমরা কেবল তাই অনুকরণের চেষ্টা করেছি, তার শুদ্ধতা রক্ষা করার চেষ্টা করে গিয়েছি। একটা নতুন দেশে ভাষার নতুন আত্মা নির্মাণের চেষ্টা করিনি, হয়তো এ দিকটি খেয়াল করার প্রয়োজনই বোধ করিনি। ভাষার প্রশ্নটিকে আমরা সত্তার প্রশ্ন হিসেবে হয়তো ভাবতেই শিখিনি।
অথচ, মনোবিজ্ঞানী জাঁক লাকা এরকমও দাবি করেন যে, আমাদের মনের গড়নটি ভাষার গড়নের মতোই। অর্থাৎ একথা বলা যায় যে, আমাদের ভাষাটি যেভাবে চর্চিত হয় আমাদের আত্মসত্তাটিও, এমনকি জাতীয় সত্তাটিও, সেভাবেই গড়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট এন্ডার্সন জাতিসত্তা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে ‘ইমাজিনড কমিউনিটিস’ বলে এক দুর্দান্ত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন ১৯৮০’র দশকে। তিনি অভিনব এই দাবি করেছেন যে, আধুনিক জাতির ধারণাটি গড়েই উঠেছে মূলত ‘প্রিন্ট ক্যাপিটালিজম’-এর সুবাদে। সংবাদপত্র আর উপন্যাস পড়ে পড়ে আমরা নতুন এক জাতীয় সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের কল্পনা করতে শিখেছি। অথচ এক দ্বিধা, এক পিছুটান আমাদের বহুধারায় বিভক্ত করে রেখেছে।
বাংলাদেশে জাতিসত্তার প্রশ্ন ঘিরে যে বিবাদ ও বিসম্বাদ, পক্ষ ও বিপক্ষের যে বৈরিতা তার সলতেটি মনে হয় এই ভাষাপ্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে। আমাদের প্রাত্যহিকের ভাষাচর্চার পরিসর তো প্রধানত সংবাদপত্র ও অন্যান্য মিডিয়াই। আর ভাষাচর্চার প্রশ্নটিকে ঘিরে সে কারণেই সংবাদপত্রের দায় ও দায়িত্ব চিহ্নিত করতে হবে। সেখানে চর্চিত ভাষায় এখনো আত্মসত্তার উদ্বোধন বাকি থেকে গেছে। সেদিকেই এখন আমাদের মনোযোগী হতে হবে।
লেখক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়