ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব

বাংলাদেশের পরোক্ষ ক্ষতিই বেশি

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে এরই মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের পর তেল রপ্তানিতে দ্বিতীয় রাশিয়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গ্যাস সরবরাহ করে। এ দেশটিতেই সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন হয়। যুদ্ধের ডামাডোলে বাড়তি দামে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কেনাবেচার কারণে বিশ্বের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকবে। বাংলাদেশের ব্যবসাবাণিজ্যেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকরা। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষের চেয়ে পরোক্ষ প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

তা ছাড়া ইউক্রেনে হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ একাধিক দেশ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞার একটি প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়তে যাচ্ছে। রাশিয়ায় রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য সময়মতো দেশে আসা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা ইউক্রেনে হামলার জেরে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক সুইফট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের নতুন বাজার রাশিয়ায় রপ্তানি বড় ধরনের হুমকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের ব্যবসায়ীরা।

গত বৃহস্পতিবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ঘোষণার পরপরই ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলা শুরু করে সামরিক বাহিনী। এ ঘটনার জেলে ব্রাসেলসভিত্তিক অর্থনৈতিক লেনদেনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) রাশিয়ার ব্যাংক লেনদেন বন্ধ করে দেয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশের সব ব্যাংকই বৈদেশিক লেনদেনের জন্য সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। ফলে দেশের কোনো ব্যাংকই এখন রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেন করতে পারছে না। এতে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় রপ্তানি করা তৈরি পোশাকের মূল্য সময়মতো দেশে আনতে পারবেন কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ব্যবসাবাণিজ্যে এখনো সরাসরি কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে রাশিয়ায় আমাদের উদ্যোক্তারা এখন পর্যন্ত যেসব পণ্য রপ্তানি করেছেন, তার মূল্য দেশে আনতে পারছেন না সুইফট বন্ধের কারণে।’ তা ছাড়া এ যুদ্ধ দীর্ঘ হলে চলমান রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যাবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন এ উদ্যোক্তা।

যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়া বা ইউক্রেনের বাণিজ্য খুবই কম। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ মোট রপ্তানির দুই শতাংশের কম রপ্তানি হয় রাশিয়ায়।

তা ছাড়া বাংলাদেশের মোট আমদানির ১ শতাংশের কম আমদানি হয় রাশিয়া থেকে। গত অর্থবছরে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর প্রায় পুরোটাই খাদ্যপণ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। অন্যদিকে আমদানি হয় ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলারের পণ্য।

তবে বাংলাদেশের গমের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ এবং ভুট্টার ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। দেশে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ করছে রাশিয়া। চলমান পরিস্থিতিতে গম-ভুট্টা সরবরাহ কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা না থাকলেও সামগ্রিকভাবে কিছুটা দুশ্চিন্তা করতেই হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহ-সভাপতি ও এমবি নিট ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছুটা বেড়েও গেছে। ফলে দেশের শিল্প খাতে এবং বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। এ ধাক্কাটা আমাদের নিট পোশাক খাতসহ গোটা অর্থনীতির জন্যই বড় শঙ্কার কারণ হতে পারে।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম সরকার কিছুদিন আগেই সমন্বয় করেছে। ফলে নতুন করে দাম বৃদ্ধির তেমন সম্ভাবনা নেই। ফলে মূল্যস্ফীতিতেও এর কোনো চাপ পড়ার আশঙ্কা সেভাবে থাকবে না। তবে অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভোগাবে। কেননা ওই সব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। অর্থাৎ সরাসরি প্রভাব না পড়লেও পরোক্ষ কিছু প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য খুবই কম। তা ছাড়া রাশিয়া কিন্তু আক্রান্ত দেশ নয়। ফলে আমাদের বাণিজ্য চলমান রাখা কঠিন হবে না। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত সমাধানের দিকে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তারপরও কিছু কাল এ যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের অর্থনীতিতেই থাকবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম ক্ষতিতে পড়বে।’

তবে ব্যবসায়ীরা সাময়িক কিছু অসুবিধার কথাও বলছেন। তারা জানান, যুদ্ধের কারণে পণ্যবাহী জাহাজ এখন কৃষ্ণসাগরে যেতে চাচ্ছে না। ফলে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। তা ছাড়া জাহাজ ভাড়া বাড়ারও আশঙ্কা করছেন তারা। এর প্রভাব আমদানি-রপ্তানি উভয় খাতেই পড়বে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। রাশিয়া থেকে সামরিক সরঞ্জামাদিও কেনা হয়েছে। বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর মতো বড় প্রকল্পের কাজ চলছে রাশিয়ার সহায়তায়। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে এসব প্রকল্পে তেমন কোনো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখছেন না বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।