বরকত কীভাবে আসে

আরবি বারাকা থেকে ‘বরকত’ শব্দটি আগত। অর্থ প্রাচুর্য কিংবা প্রবৃদ্ধি। যেমন দোয়ার সময় বলা হয়, বারাকাল্লাহু ফিক, আল্লাহ্ আপনার মধ্যে বরকত দিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু অর্থাৎ আপনার ওপর শান্তি, আল্লাহ্র রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। এভাবে শব্দটির বহুল প্রচলন থাকলেও আমরা এর বাস্তবতা অনুধাবন কমই করি। অথচ বাস্তবে অনুধাবন করার মধ্যেই শব্দটির সার্থকতা নিহিত।

পরিবারে অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও কোনোরকম হাহাকার পরিলক্ষিত না হওয়া, অল্প পুঁজির ব্যবসায়ীর সততার সঙ্গে অনেক মুনাফা অর্জন ইত্যাদি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে বরকতস্বরূপ। এভাবে দাম্পত্য জীবনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি, ছাত্রজীবনে স্মরণশক্তি তীক্ষè হওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে উন্নতি লাভ করা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে বরকত। যদিও তা ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় অর্জন বলে দাবি করা হয়, তবে তা মূলত আল্লাহরই দয়া। কারণ অভ্যাসবশত মানুষ যেকোনো উন্নতি কিংবা প্রাপ্তির ক্রেডিট নিতে চাইলেও অপ্রাপ্তি কিংবা ব্যর্থতার কোনো দায় কেউ কখনো নিতে চায় না। কিন্তু আল্লাহতায়ালা এই দুটিকেই একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন। তা কখনো আমাদের প্রতি দয়া করে, কখনো পরীক্ষা হিসেবে, আবার কখনো কর্মফল হিসেবে দিয়ে থাকেন। আর এই ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। যেমনটি তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমার কোনো ক্ষতি করতে চাইলে তিনি ছাড়া কেউ তা সরাতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তবে তো সবকিছুই করার তার ক্ষমতা রয়েছে।’ সুরা আল আনআম : ১৭

আল্লাহর পক্ষ থেকে আমরা নিয়মিত বরকত পাই। কিন্তু এগুলো আমাদের বোধগম্য হয় না। যেমন, কাউকে লম্বা সময়ের জন্য বড় ধরনের অসুস্থতা থেকে বাঁচিয়ে রাখা কিংবা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করা, কাউকে অধিক সন্তানসন্ততি দেওয়া কিংবা কাউকে অপ্রয়োজনীয় ভোগ-বিলাসিতা থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি সবই বরকত। এমন আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে যায়, অথচ প্রতিটাই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি বিশেষ নেয়ামত। এগুলো নিয়ে আলাদাভাবে কখনো ভাবা হয় না। বিষয়গুলো জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে মনে করা হয়।

কোনো মানুষে যদি আফসোস করে বলে, হায়! আমার বেতন এত কম কেন, আমি কেন গরিব পরিবারে জন্ম নিলাম ইত্যাদি। তখন আমাদের ভাবতে হবে, আমি যদি বড় কোনো রোগে আক্রান্ত হতাম, তখন কিন্তু আমার অনেক বেতনের চাকরি দিয়েও টিকে থাকতে পারতাম না। কিংবা আমি ধনী পরিবারে জন্ম নিয়েও কোনো দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকতে পারতাম। আর তখনই আল্লাহর দেওয়া বরকত আমাদের চোখে পড়বে। এ বিষয়ে কোরআনে করিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতএব তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?’ সুরা আর রাহমান : ১৩

বরকত শব্দের সঙ্গে অন্য যে বিষয়গুলো জড়িত, এর মধ্যে  গুরুত্বপূর্ণ তিনটি হলো তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ও শোকরিয়া। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করা, তার ওপর ভরসা রাখা এবং তার নেয়ামতগুলোর প্রতি শোকরিয়া প্রকাশ করা। বিষয়গুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এছাড়া আল্লাহ্র পক্ষ  থেকে বরকত লাভ করা কল্পনাতীত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা যদি ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দ্বার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা (সত্যকে) প্রত্যাখ্যান করেছে। কাজেই তাদের কৃতকর্মের বদলায় আমি তাদের পাকড়াও করলাম।’ সুরা আল আরাফ : ৯৬

বর্ণিত আয়াতের শুরুতে যে শর্ত দুটি রয়েছে, তা হলো ইমান ও তাকওয়া। যখন শর্ত দুটি পূরণ হবে, তখনই আল্লাহ্র পরবর্তী অংশে বর্ণিত বরকত পেয়ে যাব। আর ‘আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দ্বার’ বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা হলো আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ ও জমিন থেকে ফসল উৎপাদন।  তাফসিরে ইবনে কাসির

তবে এ দুটিকে আমরা বরকত হিসেবে খুব কমই মনে করি কিংবা গ্রহণ করি। কখনো বৃষ্টির তিক্ততা আর দেশীয় ফসলাদির অবজ্ঞা দিয়েই আমাদের অনুধাবন শেষ হয়। অথচ এগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়া ছিল পূর্ববর্তীদের জন্য শাস্তিস্বরূপ।

ইসলামি স্কলারদের মতে, সন্তানসন্ততি, ধন-সম্পদ কিংবা নিরাপত্তা সবই আমাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। আল্লাহর দেওয়া এসব নেয়ামতকে মানুষ যখন অবজ্ঞা করতে শুরু করবে কিংবা তা পেয়েও আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপন করবে না, তখন মানুষ আর এগুলো পাওয়ার যোগ্য থাকবে না। ফলে এগুলো মানুষের হাতছাড়া হয়ে যাবে, অন্তরগুলো অতৃপ্ত, মন-মানসিকতা ক্ষুধার্ত। ফলে মানুষের মধ্যে বিরাজ করবে হাহাকার, যা কখনোই মিটবে না। আর এমনিভাবেই অকৃতজ্ঞ বান্দাদের প্রতি আল্লাহতায়ালা শাস্তি দিয়ে থাকেন।

তাই কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে পরিচয় দিতে আল্লাহর নেয়ামতগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবনের পাশাপাশি শোকরিয়া প্রকাশ করতে হবে। আর তখনই আমরা হয়ে উঠব প্রকৃত ধনী ব্যক্তি। যেমনটি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ধনের আধিক্য হলে ধনী হয় না, অন্তরের ধনীই প্রকৃত ধনী।’ মিশকাত : ৫১৭০

বর্ণিত হাদিসে পরিতুষ্ট হৃদয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। মানুষ যখন আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করবে, আল্লাহ্র নেয়ামতের শোকরিয়া প্রকাশ করবেন, তখন আল্লাহতায়ালাও এর উত্তম প্রতিদান দেবেন। এ সম্পর্কে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চক্ষু দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং যার সম্পর্কে কোনো মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পারো, কেউ জানে না, তাদের জন্য তাদের চোখ শীতলকারী কী জিনিস লুকানো আছে।’ সুরা সাজদাহ : ১৩, সহিহ্ মুসলিম : ১৭৯৮