এগিয়ে গেল প্রশাসন ক্যাডার

রাজনৈতিকভাবে যারা সরকার গঠন করে তাদের পথ দেখান তারা। সরকারের ভেতরকার ছোট, কিন্তু শক্তিশালী গোষ্ঠী বলা হয় তাদের যা আমলা হিসেবে বেশি পরিচিত। তাদের মধ্যেই আবার তীব্র প্রতিযোগিতা আছে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আমলাদের মধ্যে লড়াইয়ে তীব্রতা এবারও দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত এ অলিখিত প্রতিযোগিতার ফসল ঘরে তুলেছে প্রশাসন ক্যাডার।

শুরু থেকেই প্রশাসন ক্যাডারের লক্ষ্য ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) পদটা ধরে রাখা। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে যা তাদের নিয়ন্ত্রণে। সদ্যবিদায়ী সিইসির ভূমিকায় এবার পদটা তাদের হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বিচারপতিদের এ পদের দায়িত্ব নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকে প্রশাসন ক্যাডার লক্ষ্য ঠিক করে এগিয়েছে। এই ক্যাডারের মধ্যম সারির কয়েক কর্মকর্তা ক্যাডারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে থেকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছেন।

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে আইন প্রণয়নের আগেই কাকে সামনে নিয়ে তারা লড়বেন অর্থাৎ সম্ভাব্য সিইসি নির্ধারণ করে রাখেন তারা। আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের সাবেক সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল ছিলেন তাদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু প্রস্তাব পেয়েই তা নাকচ করে দেন হাবিবুল আউয়াল। প্রশাসন ক্যাডারের হয়ে লবিংকারীদের সাফ জানিয়ে দেন তিনি এমন কোনো পদে যোগ দিতে চান না যেখান থেকে মানসম্মান নিয়ে ফিরে আসা কঠিন হয়ে যায়। লবিংকারী প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা তাকে বোঝাতে থাকেন পরিস্থিতি এবার কিছুটা হলেও ভিন্ন। তা ছাড়া গত সিইসি ইচ্ছা করলেই কিছু বিতর্ক এড়াতে পারতেন। ব্যক্তিগত কারিশমা থাকলে পরিস্থিতি এতটা অবনতি হতো না। তা ছাড়া নীতিনির্ধারকরাও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে সিইসি বানাতে চান। নানা তর্ক-বিতর্ক, তথ্য-উপাত্ত সব কিছু মিলিয়ে সিইসি হওয়ার চ্যালেঞ্জটা নেন কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি রাজি না হলে এ পদে বসতেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা অথবা শফিউল আলম। এ দুজনের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের পছন্দ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা হলেও সরকারের গুডবুকে ছিলেন শফিউল আলম। কিন্তু শফিউল আলম শুরু থেকেই রাজি ছিলেন না। তা ছাড়া বিশ্বব্যাংকের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনলে নতুন করে বিতর্ক হতে পারে এ চিন্তা থেকেও শফিউল ভাবনায় ইতি টানে প্রশাসন ক্যাডারের নীতিনির্ধারকরা। এক্ষেত্রে কাজী হাবিবুল আউয়াল না হলে এ পদে বসতেন মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা। আর পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ সাদিক পিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার বিবেচনায় বাদ পড়েন।

কাজী হাবিবুল আউয়ালের সম্মতির পর আরও একজন প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক সচিব বা অতিরিক্ত সচিবকে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) করার দিকে মন দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা সার্চ কমিটির ডাকে মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়া বিশিষ্ট নাগরিকদের মতামতকেও কাজে লাগিয়েছেন। মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রিতরা প্রশাসন ক্যাডার থেকেই একাধিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রিতরা বলেছেন তৃণমূল পর্যায়ে অর্থাৎ ওয়ার্ড পর্যায়ের ভোটকেন্দ্রে কী হচ্ছেতা নখদর্পণে রাখতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাই যোগ্য। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও আনিছুর রহমানকেও ইসি করা হয়।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় এবারই প্রথম তিনজন শীর্ষ পর্যায়ের আমলাকে নিয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছে, যা এর আগে হয়নি। প্রায় কাছাকাছি বয়সের হওয়ায় দেখার বিষয় তারা কীভাবে কাজ করেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাজ অনেকটাই প্রশাসনিক। প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকলে, মাঠে কে কীভাবে কাজ করে তা জানা না থাকলে নির্বাচন করাটা কঠিন। আগে যারা বিচার বিভাগ থেকে আসতেন, তাদের বেশিরভাগই ফেইল করেছেন। যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হয় তাতে প্রশাসনেরই প্রাধ্যান্য থাকে। এ কাজে প্রশাসন ক্যাডার থাকলেই সুবিধা। সেনাবাহিনী থেকে যারা আসেন তারাও এক ধরনের ব্যুরোক্রেট (আমলা)।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনটা ব্যাপক প্রশাসনিক কাজ। যেখানে ১৬ লাখ মানুষের জমায়েত হয়। একটা দেশের শান্তিপূর্ণ সময়ে এটা সবচেয়ে বড় জনসমাবেশ। যুদ্ধের সময় হয়, কিন্তু শান্তিকালীন অবস্থায় হয় না। কাজেই এ জমায়েতের উদ্দেশ্য সফল করতে গেলে প্রশাসন ক্যাডারের বিকল্প নেই।’

গত শনিবার নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে। সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল সিইসি এবং সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও মো. আনিছুর রহমান ইসি হিসেবে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে আরও আছেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবীব খান।

কাজী হাবিবুল আউয়াল বিসিএস ১৯৮১ ব্যাচের কর্মকর্তা। বিসিএস (বিচার) ক্যাডারের এ কর্মকর্তা চাকরি শুরু করেন মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে। ১৯৯৭ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (চলতি দায়িত্ব) হন হাবিবুল আউয়াল। ২০০৪ সালে হন অতিরিক্ত সচিব, সেটাও ছিল চলতি দায়িত্বই। ২০০৭ সালে পদোন্নতি পেয়ে একই মন্ত্রণালয়ের সচিব হন তিনি। সচিব হওয়ার পর ২০০৯ সালে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়েই ছিলেন হাবিবুল আউয়াল। বিচার বিভাগের এই কর্মকর্তার আইন সচিব হিসেবে নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করে ২০১০ সালে রায় দেয় আদালত। ২০১০ সালে এপ্রিলে ধর্ম সচিব করা হয় হাবিবুল আউয়ালকে। পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব করা হয়। ২০১৪ সালে সেখান থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব করে পাঠানো হয় তাকে। ওই বছরই পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সচিব হন তিনি। ২০১৭ সালে অবসরে যান তিনি।

সাবেক একজন মন্ত্রিপরিষদ সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাজী হাবিবুল আউয়াল আধা আইন ক্যাডার আধা প্রশাসন ক্যাডার। সুযোগ পেয়ে তিনি ২০০০ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যুক্ত হন। তিনি আইনের লোক হওয়ার পরও আইন বিভাগের সচিব থাকতে পারেননি আদালতের রায়ে।

চার কমিশনারের একজন হলেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর। তিনি ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি চাকরি থেকে অবসরে যান। এর আগে তিনি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ছিলেন। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। মো. আলমগীর ১৯৮৬ সালে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করেন। তার বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায়।

অপর নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব হিসেবে গত ডিসেম্বরে অবসরে গেছেন। এর আগে তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ ব্যাচের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সদস্য হিসেবে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। আনিছুর রহমান ১৯৬২ সালের ৩১ ডিসেম্বর শরীয়তপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাড়ি শরীয়তপুরে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৮ সালের পর থেকে একই ধাঁচের ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন হচ্ছে। নুরুল হুদা প্রশাসন ক্যাডারের ছিলেন, মাহবুব তালুকদারও আমলা ছিলেন। এখন দেখার বিষয় তারা কতটা কাজ করতে পারেন। সার্চ কমিটি যে ১০ জনের সুপারিশ করেছিল তা থেকে কাদের বাদ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ করা হলে সরকারের মনোভাব বোঝা যাবে।’

জনপ্রশাসনে বিভিন্ন ক্যাডারের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যে ক্যাডারের কর্মকর্তারা কোনো একটি পদে একবার বসে সেই ক্যাডার সেই পদটি নিজেদের দখলে নেয়। দেশের সব বড় হাসপাতালের পরিচালক পদে আছেন সেনাকর্মকর্তারা। বিমানবাহিনী থেকে আসেন সিভিল এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান। প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার হচ্ছে কর ক্যাডার। এ ক্যাডারের জন্য নিয়মিত জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি,  প্রশাসনিক সংস্কার হয়। তারপরও এ ক্যাডারের শীর্ষ পদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের চেয়ারম্যান করা হয় প্রশাসান ক্যাডার থেকে। এ নিয়ে কর ক্যাডারের মধ্যে বিস্তর অসন্তোষ রয়েছে। তারপরও দিনের পর দিন এ পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়োগ পাচ্ছেন। এ পদে নিয়োগের আগে ‘তদবিরের হাট’ বসে সচিবদের মধ্যে। প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় সব সচিব এ পদে নিয়োগ পেতে চান। যদিও বর্তমান চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমকে সেখানে বুঝিয়ে-সুঝিয়েই পাঠানো হয়েছে। এমনকি তার চুক্তির মেয়াদও বেড়েছে তার অনেকটাই মতের বিরুদ্ধে। 

পুলিশের আইজিদের অনেক সময়ই দেখা যায় পুলিশ থেকে সরিয়ে সচিব পদে বসানো হয়। অনেক সময় আইজি করতে না পেরেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বসিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের ওই পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। তাদেরকে বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতও করা হয়। আগের আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বর্তমানে সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। তার আগে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছেন সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদও।

জনপ্রশাসনে ক্যাডারগত প্রাধান্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যেই সরকারের ভেতর জটিলতা তৈরি হয়। এবারও বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ওপর চটেছেন প্রকৌশলীরা। জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও তদারকির ক্ষমতা ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাবের প্রতিবাদে প্রকৌশলীরা মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গত ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম দিনে ডিসিরা জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও তদারকির দাবি জানান। তাদের প্রস্তাবটি ডিসি সম্মেলনের কার্যপত্রে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায়। এর আগে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে ডিসিরা প্রস্তাব করেছেন, ডিসি ও ইউএনওদের দিয়ে করের আওতা বাড়ানোর কমিটি করতে। তখন বিসিএস কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট ও বিসিএস কর ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তারা অনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন।