ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলার শিকার জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’র ২৮ নাবিক বাংকার থেকে নিরাপদ গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। গতকাল শনিবার তাদের বহনকারী গাড়ি প্রতিবেশী দেশ মালদোভার উদ্দেশে রওনা দেয় বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ) কর্মকর্তারা।
জাহাজ থেকে উদ্ধার ও বাংকার থেকে রওনা দেওয়ার খবর পেলেও উৎকণ্ঠা কাটছে না নাবিক ও প্রকৌশলীদের পরিবারের।
বিএমএমওএ প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. এনাম চৌধুরী এই প্রতিবেদককে জানান, অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় বিধ্বস্ত ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজ থেকে উদ্ধারের পর নাবিকদের বন্দর এলাকায় একটি বাংকারে রাখা হয়। বাংলাদেশ সময় গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সেখান থেকে তাদের নিয়ে ইউক্রেনের বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি সংগঠনের গাড়ি মলদোভার দিকে রওনা দেয়। তিনি বলেন, দ্রুত ইউক্রেন থেকে বের হয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তাদের ২০০ কিলোমিটার দূরে প্রতিবেশী দেশ মালদোভায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার পথে মূল সড়কের একটি সেতু বিধ্বস্ত হওয়ায় বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি)। ডেল্টা কর্প নামে একটি ডেনিস প্রতিষ্ঠানকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজটি ভাড়া দেওয়া হয়।
সংস্থার উপ-মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আটকেপড়া জাহাজের ২৮ নাবিককে ইউক্রেন থেকে নিরাপদ গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদের মালদোভা হয়ে রুমানিয়া নেওয়ার কথা রয়েছে। এখন তারা পথে রয়েছেন। নিরাপদ স্থানে পৌঁছার পর হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি বাংলার সমৃদ্ধি গত ২১ ফেব্রুয়ারি কার্গো নেওয়ার জন্য তুরস্কের ইরেগলি বন্দর থেকে ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারি ওই বন্দরে নোঙর করে জাহাজটি। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা শুরু হলে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন জাহাজটির নাবিকরা। গত ২ মার্চ জাহাজটির ওপর রকেট হামলা হয়। হামলায় জাহাজটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অচল হয়ে যায় এর নেভিগেশন সিস্টেম ও মেইন জেনারেটর। জাহাজটির থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান এ ঘটনায় প্রাণ হারান।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনার পর জাহাজটিতে থাকা নাবিকদের বেশ ক’জন প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও-ভিডিও বার্তা দেন। দেশে থাকা তাদের স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় জাহাজটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বাকি ২৮ নাবিক ও প্রকৌশলীকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখানে একটি বাংকারে আশ্রয়ে রাখা হয় তাদের।
উদ্ধার হওয়া নাবিক ও প্রকৌশলীরা হলেনজাহাজটির মাস্টার জিএম নুর ই আলম, অতিরিক্ত মাস্টার মনসুরুল আমিন, এসিও সেলিম মিয়া, সেকেন্ড অফিসার রামাকৃষ্ণ বিশ্বাস, থার্ড অফিসার রোকনুজ্জামান রাজিব, ডেক ক্যাডেট ফারিয়াতুল জান্নাত তুলি, ফয়সাল আহমেদ সেতুন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওমর ফারুক তুহিন, এডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আরিফুল ইসলাম, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার রবিউল আউয়াল, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার সালমান সারোয়ার সামি, ফারজানা ইসলাম মৌ, মোহাম্মদ শেখ সাদি, মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, জামাল হোসাইন, মোহাম্মদ হানিফ, আমিনুল ইসলাম, মহিন উদ্দিন, হোসাইন মো. রাকিব, সাজ্জাদ ইবনে আলম, নাজমুল উদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সারোয়ার হোসাইন, মাসুম বিল্লাহ, মোহাম্মদ হোসাইন, আতিকুর রহমান, শফিকুর রহমান ও মো. সাইফুদ্দিন।
আক্রান্ত জাহাজ থেকে নাবিকদের উদ্ধার করা হলেও এখনো উৎকণ্ঠা কাটছে না তাদের পরিবারে। ‘বাংলার সমৃদ্ধি’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওমর ফারুক তুহিনের ভাই ওমর শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকাল ৯টার দিকে ভাইয়ার অবস্থা জানতে মেসেজ পাঠিয়েছিলাম। ফিরতি মেসেজে তিনি জানিয়েছেন, জাহাজ থেকে উদ্ধারের পর যে বাংকারে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে সেখানেই আছেন। সবাই সুস্থ আছেন।’
ওমর শরীফ বলেন, জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এজন্য আমরা সবাই আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করেছি। কিন্তু ইউক্রেন থেকে বের হয়ে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছার খবর না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের উৎকণ্ঠা শেষ হবে না। সবাই দোয়া করুন, তারা যেন সুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরে আসতে পারেন।’
আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ক্যাপ্টেন মনসুরুলের মা মর্জিনা খানম শোকে পাথর হয়ে গেছেন। আর শোকাতুর স্ত্রী আশরুকা সুলতানা হয়ে আছেন নির্বাক। বাবা সেলিম খান তবু নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেও চোখের পানি আটকাতে পারছিলেন না। গত শুক্রবার সাতক্ষীরা শহরের নারকেলতলার ‘এখানেই নোঙর’ বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
মনসুরুলের বাবা নুরুল আমিন খান ওরফে সেলিম খান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থার (বিএডিসি) অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি বলছিলেন, শুক্রবার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। মেসেজও পেয়েছেন। ছেলে জানিয়েছিল তারা আরও নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, ওই জাহাজের আরেক প্রকৌশলী সেলিমের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। তার বড় বোন মর্জিনা বেগম জানান, গত মঙ্গলবার তার সঙ্গে শেষ কথা হয় পরিবারের। এরপর থেকে সেলিমের ফোন বন্ধ। কোনোভাবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তারা খুব চিন্তিত।
সেলিমের স্ত্রী খালেদা বেগম বলেন, জাহাজে হামলার পর থেকে তারা উৎকণ্ঠায় আছেন। সেলিম তাদের দোয়া করতে বলেছিলেন।
তার বাবা মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘টিভির খবরে দেখেছি বাংলাদেশের জাহাজ থেকে সকলকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু আমার ছেলের সঙ্গে তিন দিন ধরে যোগাযোগ নেই।’