বৈশি্বক মহামারী করোনা স্বাস্থ্য খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে ব্যবসার ব্যবস্থাপনা; বিশেষ করে শারীরিক উপস্থিতি যতটা কমিয়ে আনা যায় তার সব চেষ্টাই করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। ক্রেতাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে সচেতনতা। অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন তারা। এ কারণে সনাতনী ধারার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও যুক্ত হচ্ছে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে। দেশের শ্রমঘন পোশাক খাতকেও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ তৈরিতে নজর দিতে দেখা গেছে। এ খাতের কর্মীদের বেতন-ভাতাও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের প্রবণতা বেড়েছে। বেড়েছে করোনার মতো মহামারী মোকাবিলা করে ব্যবসা করার দক্ষতাও।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। এরপর থেকে গত দুই বছরে করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ ছুটিসহ দফায় দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বিপণিবিতান ও রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখতে হয়েছে। এই সময়ে ব্যাংকসহ অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অর্ধেক জনবল দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের আয়-ব্যয় সমন্বয় করতে গিয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। প্রচলিত ধারার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন হোঁচট খেলেও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তৈরি করা খাবার সরবরাহের ব্যবসা বেড়েছে। মাস্কসহ স্বাস্থ্যসচেতন জীবন যাপনের বিভিন্ন সামগ্রীর বিক্রি-বাট্টা বেড়েছে। এমনকি ওষুধপত্রেরও বিক্রি বেড়েছে।
বদলে যাওয়া এই বাজারব্যবস্থায় সনাতনী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত হতে দেখা গেছে। দেশের বড় বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি অখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোও এখন অনলাইন বিপণনে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে দেশের বিজ্ঞাপনের বাজারেও দেখা গেছে পরিবর্তন। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব বাংলাদেশ থেকে বেশি করে বিজ্ঞাপন পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট নিবন্ধন সনদও নিয়েছে সম্প্রতি। ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে পণ্য বিক্রিতে ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা।
ব্যাংকিং লেনদেনে গ্রাহকদের অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে করোনাকালে। এই দুই বছরে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে যে পরিমাণ গ্রাহক জুটেছে তা গত দেড় যুগেও সম্ভব হয়নি। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ও লেনদেন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে পরিবর্তন। বর্তমান সময়ে অনেকেই তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন।
ক্যাজুয়াল পোশাকের উৎপাদন বেড়েছে করোনা মহামারীতে বিশে^র অনেক দেশেই মানুষের জীবন যাপনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকেই বিভিন্ন পার্টি বা অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলছেন। এ কারণে তাদের মধ্যে ফরমাল পোশাকের পরিবর্তে ক্যাজুয়াল পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো পোশাক রপ্তানি নির্ভর দেশে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমছে। অন্যদিকে নিট পোশাক রপ্তানি বাড়ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের পোশাক খাতের উৎপাদনে একটি বিরাট পরিবর্তন এসেছে। গত কয়েক দশকে ওভেন পোশাকের রপ্তানি মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি ছিল। করোনার আগেও নিট ও ওভেন পোশাক রপ্তানি সমান ছিল। কিন্তু এখন যেহেতু অনেক দেশে হোম অফিসের প্রবণতা বেড়েছে এবং ক্যাজুয়াল জীবনযাপন বেড়েছে এ কারণে নিট পোশাকের রপ্তানি এখন মোট পোশাক রপ্তানির ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘করোনার প্রাদুর্ভাবের পরপরই পোশাক কারখানা খোলা রাখা নিয়ে কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছিল। তবে এখন শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা গার্মেন্ট চালাতে পারছি। ফলে ভবিষ্যতে করোনার মতো মহামারীতে এ ধরনের সমন্বয়হীনতাও আর দেখা যাবে না বলে আমরা আশা করি।’
ই-কমার্স খাতের উত্থান, বিশৃঙ্ঘলা ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো: করোনার এই ডামাডোলের মধ্যে গত দুই বছরে দেশের অনলাইন মার্কেটপ্লেসের ব্যাপক চাহিদা বাড়তে দেখা যায়। তবে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে কিছু দুর্বলতা থাকায় ক্রেতাদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করার প্রবণতা দেখা দেয়এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের মধ্যে। ইভ্যালির মতো একটি দুটি প্রতিষ্ঠানকে এ ধরেনের ব্যবসা করতে দেখে অনেক ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানকে এ খাতে যুক্ত হতে দেখা যায়। ফলে এ খাতে গ্রাহকের কয়েক হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতারণা, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এ খাতের অনেক উদ্যোক্তা জেলে রয়েছেন কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ৩০-৩২টি অনলাইন মার্কেটপ্লেস এ ধরনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ায় এ খাতটির প্রতি আস্থা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে ভবিষ্যতে ই-কমার্স একটি বড় বিকল্প হবে, বিশেষ করে করোনার মতো মহামারীতে সরবরাহব্যবস্থা ঠিক রাখতে এ ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রাখার তাগিদে গত বছরের জুন ও জুলাই মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। ফলে বর্তমানে কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আর গ্রাহকের টাকা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। তা ছাড়া এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘ডিজিটাল বিজনেস আইডি’ চালু করেছে। মার্চ মাসের পর থেকে আর কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এই আইডি ছাড়া ব্যবসা করতে পারবে না। এক মাসে ৭০০টির বেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এই আইডি নেওয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করেছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান আইডি পেয়েছে।
করোনাভাইরাসজনিত কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার মাস অর্থাৎ ২০২০ সালের মার্চে ব্যাংকিং চ্যানেলে ই-কমার্সের কেনাকাটার বিল পরিশোধ হয় ২২৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরের তথ্যে দেখা যায়, এই লেনদেন প্রায় চার গুণ বেড়ে ৮২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ঝোঁক: ২০২০ সালের মার্চে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল ৮ কোটি ২৫ লাখ। বর্তমানে এই সেবার গ্রাহক সংখ্যা ১১ কোটি ১৫ লাখ; অর্থাৎ এই দুই বছরে এ খাতে নতুন করে নিবন্ধন করেছে প্রায় ৩ লাখ গ্রাহক।
বর্তমানে প্রতি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন হচ্ছে ৭০-৭১ হাজার কোটি টাকা। দুই বছর আগে মাসে এই সেবার গ্রাহকদের লেনদেন ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকা। ওই সময় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কর্মীদের বেতন দেওয়া হতো মাসে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কর্মীদের বেতন পরিশোধ হয় ২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা; অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কর্মীদের বেতন পরিশোধ দ্বিগুণ বেড়েছে।
নগদ টাকার ব্যবহার কমেছে: বর্তমানে দেশের অনেক ছোট ছোট বিক্রয় প্রতিষ্ঠানেও কার্ডে বিল নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটার বিল পরিশোধও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালের মার্চে দেশের বিপণি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৬৫ হাজার পয়েন্ট অফ সেল (পিওএস) মেশিন ছিল। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পিওএস মেশিন বেড়ে হয়েছে ৯২ হাজার।
টিকে থাকার লড়াইয়ে সুপারশপের মূল্যছাড়: করোনায় সুপারশপগুলোর ব্যবসার ধরনও বদলেছে। প্রতিটি সুপারশপেরই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চাঙা করতে হয়েছে। এর বাইরেই ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন কিছু পণ্যে নজর দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে মিনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় অনেকেই ফল খাওয়া বাড়িয়েছে। আমাদেরও সেই বিষয়টির দিকে নজর দিতে হয়েছে। তবে পাড়া-মহল্লার অলিতে-গলিতে মুদি-পণ্যের দোকান থাকায় অনেকেই এখন সুপারশপে আসার প্রয়োজন মনে করে না। সে জন্য আমাদেরও কৌশল বদলাতে হয়েছে। আমরা এখন আমাদের ফেইসবুক পেজসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আমাদের ক্যাম্পেইনগুলো করি। তা ছাড়া আমরা এখন প্রতি সপ্তাহে কিছু না কিছু মূল্যছাড় দিচ্ছি। এ কারণেও আমাদের গ্রাহক বাড়তে শুরু করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাঁচাবাজারে গরুর মাংস যে দামে বিক্রি করে আমরা তার থেকে কমে বিক্রি করছি। এই কৌশলগুলো আমাদের নিতে হয়েছে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য।’
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ঝোঁক: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি রাসেল টি আহমেদ দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করত না, করোনা দেখা দেওয়ার পরে তারাও এ খাতের দিকে ঝুঁকছে। প্রচলিত অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের গ্রাহকদের তথ্য সংরক্ষণ করে এখন। তাদের ই-মেইল করে নতুন পণ্যের প্রচার চালায়। এসএমএস মার্কেটিংও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দিবসে এসএমএস পাঠিয়ে গ্রাহকদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তো রয়েছেই। সেখানেও রয়েছে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন।’ তিনি বলেন, ‘অনেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে অনলাইন ব্যবসাকে সহযোগিতা করার জন্য। ওয়েবসাইট বানিয়ে দেওয়া, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন করে দেওয়া, গ্রাহকদের মোবাইল নম্বর সরবরাহ করা, বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট বানিয়ে দেওয়ার কাজ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এই চিত্রটা বেশি দেখা যাচ্ছে মূলত করোনার পর থেকে।’