ইউক্রেনে রাশিয়ার চালানো বিশেষ অভিযানের ১৪তম দিনে গোটা পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। বেলারুশ সীমান্তে কিয়েভ-মস্কোর মধ্যে তিন দফায় আলোচনার পর এবার তৃতীয়পক্ষ যুক্ত হয়েছে। আজ তুরস্কে ইউক্রেন ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকের আগেই এ নিয়ে আশাবাদের কথা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তার আশা, এ বৈঠক একটি ‘স্থায়ী যুদ্ধবিরতির’ দ্বার উন্মোচন করবে।
তুরস্কের আনাতোলিয়ায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রি কুলেবা। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছেন দেশ দুটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রতিনিধি হিসেবে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এতে অংশ নেবেন। তুর্কি সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ জানিয়েছে, গতকাল বুধবার রাজধানী আঙ্কারার পার্লামেন্ট ভবনে দেশটির ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) এক সভায় দেওয়া ভাষণে ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগের অবসান ঘটানোকে তুরস্ক তার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। এই বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য আঙ্কারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন ধর্ম, উৎপত্তি বা চামড়ার রঙের ভিত্তিতে নিপীড়িত মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতার সঙ্গে মানবতা বা সভ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই। তুরস্ক কখনো ভাষা, ধর্ম বা চামড়ার রঙের ভিত্তিতে যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের ওপর লেবেল লাগিয়ে দেয়নি।
ইউক্রেন ও রাশিয়া দুই দেশেরই মিত্র হিসেবে পরিচিত ন্যাটো জোটের সদস্য তুরস্ক। কৃষ্ণসাগরে উভয় দেশের সঙ্গেই তুরস্কের পানিসীমা রয়েছে। আঙ্কারা নিজে রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে। অন্যদিকে তুরস্কের কাছ থেকে কেনা বায়রাকতার টিবিটু ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করছে ইউক্রেন। চলমান যুদ্ধে খোলাখুলি ইউক্রেনের পক্ষ নিয়েছে আঙ্কারা। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে কৃষ্ণসাগরের সংযোগ স্থাপনকারী দুই তুর্কি প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করেছে এরদোয়ান প্রশাসন। এর অর্থ হলো, তুরস্ক তার পানিসীমা ব্যবহার করে রুশ যুদ্ধজাহাজকে কৃষ্ণসাগরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইউক্রেন জানিয়েছে, দেশটিকে আরও ড্রোন সরবরাহ করবে তুরস্ক। তবে কিয়েভের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দিলেও এখনো পর্যন্ত মস্কোর বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি আঙ্কারা। এরদোয়ান বলেছেন, তার দেশের পক্ষে রাশিয়া বা ইউক্রেন কাউকেই ত্যাগ করা সম্ভব নয়। দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার এবং শান্তি আলোচনার আয়োজনেরও প্রস্তাব দিয়েছে আঙ্কারা। এর অংশ হিসেবেই বৃহস্পতিবার দেশটিতে বৈঠকে বসছেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
এদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিমান হামলায় ২২ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেনের সুমি শহরে চালানো হামলায় প্রাণহানির এই ঘটনা ঘটে। সুমির আঞ্চলিক গভর্নর দিমিত্র ঝিভিতস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া রাতভর শহরের উত্তর-পূর্বের একটি আবাসিক এলাকায় বোমা হামলা করেছে। এতে ওই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আবাসিক এলাকায় বোমা হামলায় প্রাণহানির এ ঘটনাকে তিনি ‘গণহত্যা’ বলে দাবি করেন। বিবিসি ইউক্রেনিয়ানকে তিনি বলেন, ‘এক সন্ধ্যায় তিনবার বম্বিং... এটি একটি ভয়ংকর রাত ছিল।’ বিবিসি বলছে, বোমা হামলায় একই বাড়ির ৯ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া ছয়টি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরও ২০টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে মানবিক কারণে ইউক্রেনের পাঁচটি শহরে আবারও অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দিয়েছে মস্কো। মূলত রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রবল হামলার মুখে থাকা এসব শহর থেকে বেসামরিক মানুষকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরুর পর এ নিয়ে তৃতীয় দফায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিল মস্কো।