গোপনীয়তা বিষয়ে ইসলামের বিধান

‘মা, আপনি কেন আমার ঘরে ঢোকার আগে দরজায় নক করেন না?’ এ জাতীয় প্রশ্ন অনেক পুরনো। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের বড়রা বিশেষ করে মা-বাবা সন্তানদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। ক্ষেত্রবিশেষ এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। সন্তানরা প্রায়ই বুঝে উঠতে পারে না, তাদের পিতা-মাতার গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি। তাই তারাও বিনা অনুমতিতে মা-বাবার ঘরে প্রবেশের সময় এ সম্পর্কে ভাবে না। হুট-হাট তাদের ঘরে প্রবেশ করে। সন্তানদের কাছে এই কাজগুলো তেমন গুরুতর বলে বিবেচিত হয় না। কিন্তু দায়িত্ববান বাবা-মা হিসেবে আমাদের তাদের ভুলগুলো শুধরে দেওয়া, ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া আবশ্যক।

এক. ছোটরা বড়দের রুমে প্রবেশের আগে দিনের তিন সময়ে অবশ্যই অনুমতি চাইবে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের (বাবা-মা) কাছে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের নামাজের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখো (বিশ্রাম) এবং এশার নামাজের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্য কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়, এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ সুরা আন নুর : ৫৮

দুই. কখনোই অনুমতি ছাড়া কারও ঘরে প্রবেশ করা উচিত না। অপেক্ষা করতে হবে অনুমতির, তাতে যত সময়ই লাগুক না কেন। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য ঘরে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদের সালাম না দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।’ সুরা আন নুর : ২৭

তিন. যদি কারও দরজায় আওয়াজ করে তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও সে সাড়া না দেয়, তাহলে ফিরে যাওয়া উচিত। হাদিসে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত আবু মুসা (রা.) হজরত উমর (রা.)-এর কক্ষে প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তিনি কোনো অনুমতি পাননি। হজরত উমর (রা.) তাকে পরে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ফিরে গেলে কেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি আপনার কাছে প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি চেয়েছিলাম, যেমনটা রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়েছিলেন, কিন্তু আপনি অনুমতি দেননি, তাই আমি প্রবেশ করিনি। তিনি (হজরত উমর রা.) বললেন, তোমাকে এর প্রমাণ নিয়ে আসতে হবে অন্যথায়...! অতঃপর তিনি তার সম্প্রদায়ের সামনে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সত্যি কথা বলতে বললেন, অতঃপর তারা তা করল এবং তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। ইবনে মাজাহ

চার. কখনো কারও প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা উচিত নয়, হোক স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন কিংবা অন্য কেউ। কারও প্রতি সন্দেহ রেখে এটা নিয়ে গুপ্তচরবৃত্তিও ঠিক না। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনরা! তোমরা ধারণা করা থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পেছনে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণা করো, আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ সুরা আল হুজরাত : ১২

এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘সন্দেহ এড়িয়ে চলো, কারণ সন্দেহ পোষণ করলে একে অপরের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক হবে। কখনো একে-অপরের প্রতি ঘৃণাপোষণ করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না, কারও প্রতি শত্রুতা পোষণ করবে না। আল্লাহর বান্দা হিসেবে সবার সঙ্গে ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখো।’ সহিহ মুসলিম

মানুষের স্বভাব হলো, তার গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে সে প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এ ছাড়া নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই কোরআনে কারিমের এসব আয়াত এবং হাদিসগুলো শেখানোর মাধ্যমে আমরা সন্তানদের সচেতন করতে পারি এবং নিজেরা তদনুযায়ী আমল করতে পারি।