পোশাকের রাজনীতি

কর্ণাটক। ভারতের একটি রাজ্য। সেখানে একটি স্কুল ড্রেস হিসেবে হিজাব পরাতে আপত্তি জানিয়েছে। তার প্রতিবাদে মুসলিম শিক্ষার্থীরা হিজাব পরে শামিল হয়েছেন। তাদের সমর্থনে নীল কুর্তা পরে এগিয়ে এসেছে দলিত শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ নামে হিন্দুত্ববাদী একটি ছাত্র সংগঠন গেরুয়া স্কার্ফ গলায় ঝুলিয়ে মিছিল করেছে। সেই মিছিলের সামনে মুসকান নামের এক তরুণীকে হিজাব পরে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিতে দেখা গেছে। এই ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে।

অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল কলকাতার ভদ্রসমাজ জুড়ে। ফল ফলল, ভদ্রলোকীয় সমাজে গা-পা-হাত-মাথা ঢেকে মুড়ে শাড়ি পরার ঠাকুরিয় ব্রাহ্ম নিদানে।

তখন সদ্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়ে গেছে। পুরনো জমিদারদের জমিদারিতে থাকার তরিকা পুরনো হয়ে গেল।... গ্রাম-পরগনা ছেড়ে দলে দলে জমিদার-ভূস্বামী-সচ্ছল-অর্থবান-প্রখ্যাতরা কলকাতায় রওনা দিচ্ছেন। একে একে জমিদারদের প্রাসাদ গজিয়ে উঠছে আলোকোজ্জ্বল প্রগতিশীল ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে। কলকাত্তিয়া নবজাগরিত ভদ্রলোকরা তত দিনে ছোটলোকদের টাইট করে দিয়েছেন। কারিগররা বিশ্ববাজার থেকে হটে গেছে। ঢাকার গরিমা শেষ। স্বাধীনতাসংগ্রামে তাঁতিরাও অংশ নিচ্ছেন। ভদ্ররা ঠিক করলেন টেঁটিয়া তাঁতিদের বোঝানো যে, দয়ালু ব্রিটিশ সরকারের কত ক্ষমতা। আবারও ভাত মারতে চেষ্টা করল। সূক্ষ্ম কাপড় তৈরিতে বাংলার তাঁতিদের চরমতম দক্ষতা ছিল তারা ব্রিটিশদের সুতি পরা শিখিয়েছিল। যে কাপড় পাল-সেন-সুলতান-মোগল-নবাবি আমলে শাসকদের গর্বের ছিল, অশ্লীল অভিধার বদলে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। নবজাগরিত ভদ্ররা অশ্লীলতা রোধে জমিদারদের চাপ দিলেন সেই সূক্ষ্ম কাপড় উৎপাদন বন্ধের জন্য। প্রভুদের তৈরি ম্যানচেস্টারের মিলের মোটা কাপড়ের আর সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। ‘উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান’ বইয়ে সুমন্ত্র বন্দ্যোপাধ্যায় এমনটাই লিখেছেন।

২. ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ, লন্ডন। জি এস সাগর নামে জনৈক শিখ ম্যানচেস্টার ট্রান্সপোর্টে বাস ড্রাইভারের পদে আবেদন করেন। পাগড়ির বদলে স্থানীয় প্রশাসনের যানবাহন শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট ড্রেসের ক্যাপ পরতে অস্বীকার করেন। ফলে আবেদন খারিজ হয়। সাগরের যুক্তি ছিল, এটি আবশ্যিক ধর্মীয় পোশাক। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যখন পাগড়ি পরে হাজার হাজার শিখ তরুণ কয়েকশ যুদ্ধে অংশ নিয়ে সাম্রাজ্যকে বিজয়ী করছে। অন্যদিকে আমলাদেরও দুশ্চিন্তা, ড্রেসের যদি ব্যতিক্রম হয় তাহলে সংগঠনের পতন কোথায় গিয়ে ঠেকবে! তাই নির্দিষ্ট পোশাকই পরিধান করতে হবে।

ঘটনাটি নৃবিজ্ঞানী বার্নার্ড এস কোহন তার ‘সাম্রাজ্যের মন ও মান’-এ উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও লেখেন, কীভাবে চাকরিদাতারা তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, নৈতিকতা চাকরিপ্রার্থীদের পরিধেয়, চেহারা ও ধর্ম বিশ্বাসের ওপর চাপিয়ে দেয়। এ ঘটনার সাত বছর আগে আইরিশদের জাতীয় পোশাক ‘কিল্ট’ পরা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। এই বিতর্কটি ছিল মূলত ভারতীয় আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে আর্থিক-রাজনৈতিক-কৃষ্টি উচ্ছেদের ও শাসক-শাসিতের পোশাকের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের ইস্যু। স্বাধীন বাংলাদেশে তবে কি ইস্যুটির মীমাংসা হয়েছে?

৩. পোশাক দুনিয়াময় রাজনীতির প্রতীক ছিল এবং এখনো আছে। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণও ছিল রাজনীতিই। ভারতে মুঘল সম্রাটরা কাউকে বিশেষ সম্মান দেখাতে চাদর পরিয়ে দিতেন। এখনো উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। নতুন ক্ষমতাসীনকেও পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়। সেটা সম্রাট, রাজা কিংবা জমিদার সবার বেলাতেই। বার্নার্ড এস কোহনের ‘সাম্রাজ্যের মন ও মান’ (অনুঃ বিশ্বেন্দু নন্দ, ডাকঘর) গ্রন্থে এফ ডব্লিউ বাকলার বলছেন, এই সাম্মানিক বস্ত্র আদতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা ও প্রবহমানতার চিহ্ন। এই চিহ্ন শরীরকেন্দ্রিক, যা ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনের মধ্যে চুক্তির ভূমিকা পালন করে।

যে বস্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার অংশ হস্তান্তর হয়, তাকে মুঘলরা খেলাত বলতেন। ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে যে পোশাক, তাই খেলাত। মুঘল ভারতে এই খেলাত ছিল তিন, পাঁচ ও সাতটি পোশাক থাকত। শ্রেণির ওপর সংখ্যানির্ভর করত। সাতখানা খেলাত হচ্ছে : পাগড়ি, জোব্বা, লম্বা জামার ওপর আঙরাখা বা কটি, আলখিলাক নামের আঁটসাঁট জামা, কোমরবন্ধ, পায়জামা ও উত্তরীয়। তবে সেই পোশাক তারা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেননি।

উপমহাদেশে মাথার পাগড়ির ব্যবহার হয়। পীররা পাগড়ি পরিয়ে খেলাফত প্রদান করেন। হাফেজদেরও পাগড়ি প্রদানের নিয়ম আছে। পীরালি তরিকায় এখনো কাপড়ের ব্যবহার আছে। কারণ পোশাক পরিধান বা ছোঁয়ার মাধ্যমেই ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে। পোশাক শুধু দেহ আবরণী বা সজ্জা নয়, শুধু ক্ষমতার প্রতীকই নয়। কখনো কখনো নিজেই ক্ষমতা হয়ে ওঠে।

মুঘলরা ধর্ম ও জাতির পোশাকে হস্তক্ষেপ করেননি। সবাই নিজ নিজ পোশাক নিয়ে সরকারি কাজে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু ব্রিটিশরা উপমহাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যময় পোশাকের মধ্যে পরিবর্তন এনেছে। আইসিএস কর্তাদের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশে এখন সরকারি কর্মচারীদের ড্রেস কোড আছে। গরমের দেশে উকিলরা কালো গাউন পরেন।

৪. যারা ক্ষমতার অংশ বা নতুন ক্ষমতা নির্মাণ করতে চান, তাদের দেহও ক্ষমতার অংশ। গান্ধীজির ধুতি-চটি, ভাসানী হুজুরের লুঙ্গি-বেতের টুপি আর শেখ সাবের মুজিব কোট এই ক্ষমতার অংশ ছিল। এই ক্ষমতা এক দেহ থেকে আরেক মানবদেহে চারিয়ে দেওয়া যায়। সেই মানবদেহকে ক্ষমতার সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন অনুসারী তৈরি করে। চিলমারীর চরে জোড়গাছহাটেও হকার গাড়ি নিয়ে হন। নতুন দেহ নতুন ক্ষমতার সঙ্গে নতুন পোশাক লাগিয়ে নিয়ে শাসনতন্ত্রের নতুন কাঠামো নির্মাণ করে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শফিউদ্দীন সরকার বলেছিলেন, ভাসানীর বদলে বঙ্গবন্ধুর সামনে আসার অন্যতম কারণ নাকি পোশাকই। বলা হয়, ৭১ পূর্ববর্তী রাজনীতি পাঞ্জাবি-লুঙ্গির হলে পরবর্তী রাজনীতি সাদা পায়জামার।

আওয়ামী লীগের ১২ বছরের শাসনে মুজিব কোট ক্ষমতার অংশ হয়ে পড়েছে। তেমনি লুঙ্গি পরে কেউ অফিস-আদালতসহ কোথাও প্রবেশাধিকার পান না। স্বাধীন বাংলাদেশের কর্মচারীরা পরছেন ব্রিটিশ দেশের জাতীয় পোশাক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যদি পাঞ্জাবি-লুঙ্গি পরতেন, তাহলে জনগণের সঙ্গে আমলাদের দূরত্ব কিছুটা কমত বলে অনেকেই মনে করেন। ব্রিটিশরা পোশাকের রাজনীতি বুঝেছিল, বুঝেছিলেন আমাদের রাজনীতিবিদরাও। কিন্তু উকিল-রাজনীতিবিদরা তা প্রয়োগ করলেন না শুধু। মুক্তিযুদ্ধের যেকোনো ফটো দেখলে সবাই বুঝবেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত লুঙ্গি পরা মানুষদেরই যুদ্ধ।

লেখক : রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি

nahidknowledge@gmail.com