দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে যে কোনো কাজের সুফল থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও উচ্চারিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া জনগণের শ্রম ও ঘামের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতার ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কিন্তু তারপরেও প্রায়ই দেখা যায় একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় অর্থের যথেচ্ছা ব্যবহার করছেন। আবার কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেরাই আত্মসাৎ করেন। দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত সংবাদে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন বছরে প্রায় ১০৭ কোটি টাকা আত্মসাতের খবর এমন ঘটনার সাক্ষ্য দেয়।
প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আর এর আগের সাত বছরের আংশিক হিসাবে আরও ৪৩ কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ মিলেছে। গত ২০ বছরের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষায় লুট করা অর্থের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। বিএসটিআইয়ের নিজস্ব আয় থেকে এ অর্থ লোপাট করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুটি আইন, একটি আদেশ, চাকরি প্রবিধানমালা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি অনুশাসনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত এ তিন বছরে বিএসটিআইয়ের ঢাকাসহ সারা দেশের আঞ্চলিক কার্যালয়ের ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯৬ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঝুঁকি ও প্রণোদনা ভাতার নামে এ অর্থ নিজেদের পকেটে ভরেছেন। এ অর্থ মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নসহ বিভিন্ন ফি, যা বিএসটিআইয়ের আইন অনুসারে সরকারের কোষাগারে জমা পড়ার কথা। কিন্তু তা না করে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা রাষ্ট্রীয় এই অর্থ নিজেরা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। এ ঘটনায় কাউকে শাস্তির মুখোমুখিও করা হয়নি। আইনের ফাঁক গলে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
দেশের মানুষ সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের সুফল কতটা ভোগ করতে পারছে বা পারবে তা নির্ভর করে মূলত দুটো বিষয়ের ওপর। এক. প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সুপরিকল্পিত; দুই. কর্মসূচিগুলো কতটা অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি এখন এতটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে যে, কর্মসূচি প্রণয়নের সময় দুর্নীতির নীলনকশা প্রস্তুত করা যেন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে বিএসটিআইয়ের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে না দিয়ে আত্মসাৎ করে কীভাবে? জনমনে এই ধারণা জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে টাকা দিলে তা সেখানকার কর্মকতারাই লুটেপুটে খান। জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২০ নভেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয় বিএসটিআইয়ের বেসরকারি আয় সম্পর্কে একটি অনুশাসন অনুমোদন করে। সেখানে বলা হয়, বিএসটিআইয়ের বেসরকারি আয় বলতে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদানের জন্য পণ্যের মান পরীক্ষা থেকে যে আয় হবে সেটা কোনোভাবে বেসরকারি আয় হিসেবে দেখানো যাবে না। বিএসটিআইয়ের নিয়মিত কাজ বিঘœ না করে কোনো বেসরকারি উৎপাদনকারীর আবেদনের ভিত্তিতে তার পণ্যের মান যদি বিএসটিআইয়ের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করায় সেই পরীক্ষা ফি কেবল বেসরকারি আয় হিসেবে দেখানো যাবে। এরকম বেসরকারি আয়ের ৪০ শতাংশ বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা যাবে। বাকি ৬০ শতাংশ আয় বিএসটিআইয়ের তহবিলে জমা দিতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয়ের অনুশাসনকে উপেক্ষা করে নতুন লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নের জন্য বেসরকারি কোম্পানি যে নমুনা পরীক্ষা করে সেই পরীক্ষার ফির ৪০ শতাংশ লোপাট করেছে। এটা সরকারি অর্থ লোপাট।
সরকারি এরকম অর্থ লোপাটের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য দুর্নীতি বা অর্থ তছরুপের দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে। সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের অলিখিত দায়মুক্তিকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকার মতো অর্থনৈতিক প্রগতির খবর যেমন আশা জাগানিয়া, তেমনি সর্বগ্রাসী দুর্নীতির খবর সেই আশাভঙ্গের কারণ। কেননা, দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কাজেই দুর্নীতি রোধে সরকারের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত। যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব জনগণের জন্য বাজারজাত করা মানসম্মত খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সেই বিএসটিআই যদি এভাবে অর্থ লোপাট করে তাহলে তারা কতোটা দায়িত্বপালন করছেন সেটা ভাবা জরুরি।