করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে মোট মৃত্যু সরকারি মৃত্যুর হিসাবের প্রায় ১৫ গুণ বেশি বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক গবেষণায় জার্নালটি জানিয়েছে, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পযন্ত দুই বছরে বাংলাদেশে করোনায় মোট মারা গেছে ৪ লাখ ১৩ হাজার জন। কিন্তু সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২৮ হাজার ১০০ জন।
দ্য ল্যানসেটের এই দাবি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাকালীন সময়ে শনাক্তের বাইরে করোনা উপসর্গ নিয়ে যে সংখ্যক মানুষ মারা গেছে, সেটা করোনায় মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশের বেশি নয়। সে হিসাবেও ল্যানসেটের তথ্যের সঙ্গে মেলে না। ল্যানসেটের এই গবেষণা পর্যালোচনা করতে হবে। ঢালাওভাবে মন্তব্য করাটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।
গত বৃহস্পতিবার দ্য ল্যানসেট তাদের ওয়েবসাইটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনায় মৃত্যুর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশে মৃত্যুর সরকারি হিসাব ও তাদের গবেষণায় উঠে আসা মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে।
করোনায় বৈশ্বিক মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, সরকারি তথ্য অনুযায়ী কভিড মহামারী শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বে আক্রান্ত হয়ে ৫৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এ মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় সারা বিশ্বে মৃত্যুর হিসাবের চেয়ে তিনগুণ বেশি। অর্থাৎ গত দুই বছরে ১ কোটি ৮২ লাখের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মারা গেছে।
বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবে করোনায় মারা গেছে ২৮ হাজার ১০০ জন, যা প্রতি লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এ সময় অতিরিক্ত ৪ লাখ ১৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এ মহামারীতে। এই সংখ্যা ৩ লাখ ৪৭ হাজার থেকে ৫ লাখ ৪ হাজারের মধ্যে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এমনকি মোট জনসংখ্যা অনুপাতে মৃত্যুর হার ১৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলেও গবেষণায় দাবি করা হয়।
অবশ্য দ্য ল্যানসেট তাদের গবেষণায় এ সময় মৃত্যুর যে সরকারি হিসাব তুলে ধরেছে, তা সঠিক নয়। কারণ সরকারি হিসাবে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন ২৮ হাজার ৭২ জন, কিন্তু ল্যানসেট বলেছে ২৮ হাজার ১০০ জন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১৯১টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে করোনার সংক্রমণে মৃত্যু বেশি হওয়ার এ তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, কিছু মৃত্যু ঘটেছে ভাইরাসের কারণে; আর কিছু মৃত্যু হয়েছে এর সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতায়। যেমন কারও শারীরিক সমস্যা থাকলে করোনা সংক্রমণের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে দেখা যায়।
মৃত্যুর সংখ্যা বের করতে গবেষকরা বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইট, ওয়ার্ল্ড মরটালিটি ডাটাবেজ, হিউম্যান মরটালিটি ডাটাবেজ ও ইউরোপীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তারা আগের ১১ বছরের পরিসংখ্যানের আশ্রয় নিয়েছেন। অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যায় দেশ ও অঞ্চলভেদে তারতম্য দেখেছেন তারা।
দ্য ল্যানসেটের এই গবেষণা কোনো প্রক্রিয়াতেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে যেটা বলা হয়েছে, নিশ্চয় সেটার চেয়ে বেশি আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কত বেশি? মৃত্যু বের করার দুটি প্রক্রিয়া আছে। একটি হলো ২০২০ সালে বাংলাদেশে কভিডসহ ও কভিড ছাড়া কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে? এই মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৯ সালে কত? পার্থক্যটা যদি বের করা যায়, তাহলে সেটার গড় মৃত্যু কি লাখ লাখ? ২০২১ সালে কত মানুষ মারা গেছে, যেটা ২০১৯ সালের চেয়ে কত বেশি? যদি এটা হয় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেড় লাখ ও ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দেড় লাখ, অর্থাৎ তিন লাখ মানুষ বেশি মারা গেছে, তাহলে মানতে রাজি আছি। কিন্তু তা তো নয়।
এ্ই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, মৃত্যু বের করার আরেকটা প্রক্রিয়া হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ বিভাগ দেশে যত লোক শনাক্তের বাইরে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে, তাদের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেটাও নিশ্চয় তিন লাখ নয়। সেই সংখ্যাও সরকারি হিসাবে মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশেরও নিচে। সেটাও যদি যোগ করি তা হলে বর্তমান মৃত্যুর সঙ্গে খুব বেশি হলে আরও পাঁচ হাজার যোগ হতে পারে। ফলে ল্যানসেটের এই গবেষণা কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে মেলে না ও তাদের সংখ্যা এসব প্রক্রিয়ার কাছাকাছিও নয়।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে কেউ যদি মারা যায়, কেউ লাশ লুকাতে পারবে না। গোরস্তানে রেকর্ড হয়। স্থানীয় সরকার সেটা রেকর্ড করে। হিন্দুরা যে শ্মশানে মরদেহ দাহ করে, সেটাও কেউ লুকাতে পারবে না। কাজেই মোট মৃত্যু বের করা সহজ। এখন জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন স্থানীয় সরকার ঠিকভাবেই করে থাকে। ল্যানসেট দুই বছরে করোনায় যে মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে, দেশে মোট মৃত্যুও তো এত বেশি হবে না।
ল্যানসেটের গবেষণায় অন্যান্য দেশের মৃত্যু : গবেষণায় দেখা যায়, করোনায় সাতটি দেশে বিশ্বের মোট মৃত্যুর অর্ধেক ঘটেছে। এগুলো হলো ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান। ভারতে সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে ৪১ লাখ বেশি মারা গেছে। করোনায় বিশ্বে যত মানুষ মারা গেছে, তার ২২ শতাংশই ঘটেছে ভারতে। তবে সরকারি হিসাবে দেশটিতে মৃত্যু ৫ লাখ ১৬ হাজারের কাছাকাছি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, করোনা মহামারীতে মৃত্যুর হার বেশি ছিল লাতিন আমেরিকার স্বল্প আয়ের দেশে এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলেও। তবে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো অধিক আয়ের দেশেও মৃত্যুহার অনেক বেশি ছিল। কভিডে মৃত্যুহারের দিক থেকে শীর্ষে থাকা পাঁচটি দেশ হচ্ছে বলিভিয়া, বুলগেরিয়া, এসওয়াতিনি, উত্তর মেসিডোনিয়া ও লেসোগো। সবচেয়ে কম মৃত্যুহার ছিল আইসল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড ও তাইওয়ানে।