দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন সাফল্যমাখা দিন খুব বেশি আসেনি। এমনকি কোনো মাল্টি ডিসিপ্লিন গেমসের নির্দিষ্ট একটা দিন এত এত সাফল্যের বার্তা নিয়ে হাজির হয়নি কখনো। ২০১৯ এসএ গেমসে আরচারদের দশ সোনা জয়ের দিনও এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। শুরুটা ক্রিকেট দিয়ে। এরপর আরচারি, হকি, অ্যাথলেটিক্স, সব শেষে কাবাডি দিয়েছে খুশির বার্তা। এমন দিনে অবশ্য সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন নাসরিন আক্তার। থাইল্যান্ডে এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং আরচারিতে (স্টেজ-১) বাংলাদেশের জেতা তিন স্বর্ণপদকে অবদান রেখে দিনটি নিজের করে নিয়েছেন সোনার মেয়ে।
গভীর রাতে ঘুমুতে যাওয়া ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রোটিয়াদের হারানোর ইতিহাস সঙ্গে করে। একটু দেরি করে ঘুম ভাঙতেই থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে আরচাররা দিতে থাকেন একের পর এক আনন্দ সংবাদ। দুপুর গড়াতেই ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে হকি দল এএইচএফ কাপের ফাইনাল নিশ্চিত করে কাজাখস্তানকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে। যে জয়ে নিশ্চিত হয় পরবর্তী এশিয়া কাপ হকিতে সরাসরি খেলার টিকিট। এই ফাঁকে সার্বিয়ার বেলগ্রেডে বিশ্ব ইনডোর অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ৬০ মিটার স্প্রিন্টের হিটে নেমে রীতিমতো চমকে দেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমান। হিট পেরিয়ে তিনি নাম লেখান সেমিফাইনালে। আর সন্ধ্যা ঘনাতেই ঘরের মাঠে দুর্বল ইংল্যান্ডকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু কাপ আন্তর্জাতিক কাবাডি টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় শিরোপার অভিযান শুরু করে শক্তিশালী বাংলাদেশ।
এত এত সাফল্যের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে চেনালেন নাসরিন। বছর শুরুর আসর এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং টুর্নামেন্টের (স্টেজ-১) রিকার্ভ মিশ্র দলগত ইভেন্টের ফাইনালে রোমান সানার সঙ্গে জুটি বেঁধে ভারতের জুটিকে হারিয়ে দিন শুরু ২৪ বছরের আরচারের। এরপর রিকার্ভ মহিলা দলগত ইভেন্টেও দিয়া সিদ্দিকী ও ফাহমিদা সুলতানা নিশাকে নিয়ে ভারতকে হারিয়ে দ্বিতীয় স্বর্ণপদকের স্বাদ নেন নাসরিন। আর বিকেলে স্বদেশি দিয়া সিদ্দিকীকে ফাইনালে হারিয়ে প্রথমবারের মতো রিকার্ভ একক ইভেন্টে আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক জিতে নেন পটুয়াখালীর মেয়ে।
রিকার্ভ মেয়েদের এককের ফাইনালে নাসরিন ও দিয়ার নাম লিখানোর মধ্য দিয়ে দু’দিন আগেই স্বর্ণপদক নিশ্চিত হয়েছিল। এককের ফাইনালে প্রতিপক্ষ হলেও দিয়া ছিলেন নাসরিনের দলগত ইভেন্টের সতীর্থ। তার আগে রিকার্ভ মিশ্র দলগত ইভেন্টের ফাইনালে ভারতের জুটিতে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসটা বাড়িয়ে নেন ২০১৪ সালে আরচারি ক্যারিয়ার শুরু করা নাসরিন। ২০১৯ সালে এসএ গেমসে স্বর্ণপ্রসবা বাংলাদেশ দলের সদস্য হয়েও কোনো পদক না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল নাসরিনের, ‘এসএ গেমসে দলের সবাই যখন স্বর্ণপদক জিতে উল্লাস করছিল, তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল। আমি সেবার চতুর্থ হওয়ায় কিছুই জিততে পারিনি। সেই আক্ষেপটা এতদিন বয়ে বেড়িয়েছি। আজ সেটা দূর হলো এবং সেটা আরও বড় মঞ্চে তিন স্বর্ণপদক জিতে। এই মেডেলগুলো আমি দেশবাসীকে উৎসর্গ করছি। দেশে ফিরে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে মেডেলগুলো তুলে দিতে।’
রোমানের সঙ্গে মিশ্র দলগত ইভেন্টে সেরা হওয়ার পর দিয়া ও নিশাকে নিয়ে নাসরিন দলগত ইভেন্টে ভারতকে ৫-৪ সেটে হারান। এই জয়ে এককের ফাইনালে চেনা প্রতিপক্ষ দিয়াকে হারানোর আত্মবিশ্বাসটা চলে আসে নাসরিনের মধ্যে, ‘আসলে তিন ইভেন্টের ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই মনে হচ্ছিল দিনটি আমার হবে। তাছাড়া দিয়ার সঙ্গে তো এর আগেও অনেকবার খেলেছি। দিনটা ভালোভাবে শুরু হওয়ায় মনে হচ্ছিল এককেও হয়ে যাবে।’ আসলেই সেটা হয়ে যায়। ব্যবধানটাও অনেক; ৬-২ সেট পয়েন্টে। শুরুর দুই সেট ২৮-২৬ ও ২৮-২৬ পয়েন্টে জিতে নেন নাসরিন। পরের দুই সেটে ঘুরে চেষ্টা করেও পারেননি দিয়া। তৃতীয় ও চতুর্থ সেটে ২৮-২৮, ২৭-২৭ ড্রয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে স্বর্ণপদক নিশ্চিত করেন নাসরিন।
মেয়েদের এই সাফল্যে দারুণ উচ্ছ্বসিত জার্মান হেড কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ, ‘এতদিন ছেলেরাই বেশি ভালো করছিল। ২০১৯ এসএ গেমসে ভালো করার ধারাবাহিকতাটা মেয়েরা হারিয়ে ফেলে। বছর শুরুর আসরে মেয়েদের এভাবে জ্বলে ওঠাটা কোচ হিসেবে আমার জন্য অনেক বড় স্বস্তির। এই সাফল্য বিশ্ব র্যাংকিংয়েও আমাদের আরচারদের এগিয়ে নেবে অনেকটা। যা ভবিষ্যতে অলিম্পিকের ক্ষেত্রে কাজে দেবে।’ নাসরিনের প্রশংসা করে কোচ বলেন, ‘ও অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছিল। খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে কেন জানি আন্তর্জাতিক মঞ্চে হচ্ছিল না। এই আসরে ও ছিল এক কথায় অসাধারণ।’ বছরব্যাপী প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার সুযোগেই বাংলাদেশের আরচারদের উন্নতি হচ্ছে দাবি করে ফ্রেডরিখ বলেন, ‘এখন আর আমরা এক-দু’জনের পর নির্ভরশীল নই। কিছুদিন আগে রুবেল ও দিয়া মিশ্র দ্বৈতে ভালো করেছে। আজ (গতকাল) নাসরনি রোমানের সঙ্গে ভালো করল। তাছাড়া একক ইভেন্টেও পারফরমারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ সব কিছুই ইতিবাচক। বাংলাদেশের আরচারি নিয়ে ধীরে ধীরে স্বপ্নটাও সবার বড় হচ্ছে। এটাকে ধরে রাখতে হবে।’
আগামী মাসে তুরস্কে বিশ্বকাপ (স্টেজ-১) খেলতে যাবেন বাংলাদেশের আরচাররা। পরের মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় হবে বিশ্বকাপ (স্টেজ-২)। সেপ্টেম্বরে এশিয়ান গেমসের আগে আছে অনেকগুলো আসর। নাসরিন-দিয়া-রোমানরা এভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে হ্যাংঝু এশিয়াডেও ভালো কিছুর আশা করা যায় আরচারিকে ঘিরে।