পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো আস্থা ভোটের মুখোমুখি ইমরান খান। বিরোধীদের চাপ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে শুক্রবার তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উঠছে পার্লামেন্টে। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
রাজনৈতিক ঝড়
এক তীব্র রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। বিরোধীদলগুলোর রাস্তায় কঠোর আন্দোলন এবং দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সব কিছু মিলিয়ে শঙ্কায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন। যাকে ঘিরে পাকিস্তানে এই রাজনৈতিক সংকট তিনি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের একমাত্র ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের রূপকার। ক্রিকেট মাঠ ছাড়লেও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে ১৯৯৬ সালে নিজ হাতে গড়া নতুন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নিয়ে আস্তে আস্তে দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসেন ইমরান খান।
মানুষের আশা ছিল, সাফল্য এনে বদলে দেওয়া ক্রিকেট দলের মতো দেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতির একটা পরিবর্তন আসবে ইমরানের হাত ধরে। তবে দিন যত গড়িয়েছে, সেই পুরনো রাজনৈতিক চেতনা ধীরে ধীরে ভর করেছে ইমরান খানের ওপর। দল ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর ধরপাকড় ছাড়াও মামলা এবং রাজনৈতিক নিগ্রহের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলা ইমরানের খুব কাছের মানুষদের বিরুদ্ধেই উঠতে শুরু করে বিশাল অঙ্কের টাকা পাচারের অভিযোগ। আর এতেই যেন তার বিরুদ্ধে আগুনটা লাগে আরও তীব্র করে।
পাকিস্তানের জিয়ো নিউজ, জং ও দ্য নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইউক্রেন সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর বিরুদ্ধাচরণ, আফগানিস্তানে পশ্চিমাদের সমর্থন সত্ত্বেও ইমরানের উপেক্ষার নীতি, রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান, ভারতের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে মিত্রতার চেষ্টা পাক সেনাবাহিনী ও বিরোধীদলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে।
মেয়াদ পূরণ করতে না পারা ২২ প্রধানমন্ত্রী
‘এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।’ পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট শপথ নেন ইমরান খান। ধারণা করা হচ্ছিল, ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার ডাক দিয়ে ক্ষমতায় বসা ইমরান খানের হাত ধরে এবার হয়ত বদনামটি ঘুচবে। কিন্তু সেটাও এখন আর নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পরশুর (২৫ মার্চ) আস্থা ভোটে হেরে গেলে বিদায় ঘণ্টা বাজবে তার, আর কোনোভাবে আস্থা ভোট এড়িয়ে ইমরান ক্ষমতায় থাকতে চাইলে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করছে রাজনৈতিক মহল। প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ পাইয়ে দেওয়া ইমরান ২২ গজের পিচে নানা সময় দলের বিপর্যয় সামলে সাফল্য এনে দিয়েছেন। মাঠের দুর্দান্ত এই খেলোয়াড় কি পারবেন রাজনীতির মাঠের ইনিংস মেরামত করে ক্ষমতায় থাকতে?
এতদিন যেখানে বিরোধীদলগুলোই শুধু ইমরানের বিরুদ্ধে কথা বলত, সেখানে এখন নিজ দলের ভেতর থেকেই তার সরে যাওয়ার আবেদন উঠতে শুরু করেছে, যা তাকে তীব্রভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। প্রকাশ্যেই পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নাজিব হারুন বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পদত্যাগই দেশের চলমান সংকট অবসানের একমাত্র উপায়। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দলের অন্য কোনো সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য সামনে আনা উচিত।’
কার পক্ষে কতজন এমপি
ক্ষমতা গ্রহণের দুই বছর সাত মাসের মাথায় ২০২১ সালের মার্চ মাসে ইমরান খান আরেকবার মোকাবিলা করেন অনাস্থা ভোট। সেবার ১৭৮ জন এমপির সমর্থন পেয়ে টিকে যান। ঠিক এক বছর পর ফের এই মার্চ মাসেই অনাস্থা ভোটের মুখে পড়ছেন তিনি। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন। বিরোধী দলগুলো তাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে বেশ জোরেশোরে মাঠে নেমেছে। এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে টালমাটাল অবস্থা বিরাজমান। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশের চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থার মাঝে ইমরানের সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে সরকার পরিবর্তনের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে পাকিস্তানে। পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির ধারা এখনো অব্যাহত। দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। ইমরানের বিরুদ্ধে সরকার পরিচালনায় সার্বিক ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগ শুধু বিরোধীদের নয়, ইমরানের দলের অন্তত ২৪ সদস্য এ বিষয়ে বিরোধীদের সঙ্গে একমত বলে সংবাদমাধ্যমের খবর। তাই শুক্রবার সংসদে অনুষ্ঠেয় আস্থা ভোটে তাদের ভোট যেতে পারে ইমরানের বিরুদ্ধে। নিজের দলের সাংসদরা বিরুদ্ধে ভোট দিলে সাড়ে তিন বছর সাত মাসের মাথায় ইমরান খানের বিদায় নিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ৩৪২ সদস্যের সংসদের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে কমপক্ষে ১৭২টি ভোট পেতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা একরকম অসম্ভব। পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন ৫ দলের জোট সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে ইতিমধ্যে তিনটি শরিক দল বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই তিন দল হলো মুসলিম লীগ-কায়েদ পার্টি (৫), বেলুচিস্তান আওয়ামি পার্টি (৫) ও মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (৭)। অবশ্য মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এখনো তিন দলের নেতাদের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো। অন্যদিকে পার্লামেন্টে বিরোধীদের ঝুলিতে যৌথভাবে ১৬২টি আসন রয়েছে, সরকার গড়তে তাদের দরকার আর মাত্র ১১টি আসন। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএলএম-এন) নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকন আব্বাসী জানিয়েছেন, ১৭২ জনের সংখ্যায় পৌঁছানোর জন্য বিরোধী দলগুলোয় আছে মোট ১৬২ জন এবং সমর্থন দেবে জামায়াতে ইসলামির একজন। ইমরান খানের দলের দুই এমপি প্রকাশ্যে তাদের বিরোধিতা করেছেন। বাকি থাকল, আট ভোট। আমাদের কাছে যে সংখ্যা রয়েছে তা এর চেয়ে অনেক বেশি। কৌশলগত কারণে তাদের নাম প্রকাশ করছি না।
পাকিস্তানের সংসদের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদের স্পিকার আসাদ কায়সার ইতিমধ্যে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। শুক্রবার বেলা ১১টায় অনাস্থা প্রস্তাবটি তোলা হবে। সংবিধান অনুযায়ী, অনাস্থা প্রস্তাব যথাযথভাবে স্পিকার বা সংসদ সচিবালয়ে জমা দেওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন ডাকা বাধ্যতামূলক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলগুলোর আইনপ্রণেতারা অনাস্থা প্রস্তাবটি জমা দেন ৮ মার্চ। সে অনুযায়ী ২২ মার্চের মধ্যেই অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকার কথা ছিল। কিন্তু ২২ থেকে ২৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের মূল কক্ষে অনুষ্ঠেয় ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৮তম সম্মেলনের কারণে অনাস্থা প্রস্তাব দুই দিন পর উত্থাপনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আপস ও অভিশাপ তত্ত্ব
পাকিস্তানি গণমাধ্যমে ইমরান খানের পক্ষীয় নেতারা বলছেন, ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দেশটির বিরোধীদল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) জোটের সঙ্গে আঁতাত করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধানসহ ইমরানের দল পিটিআইর কিছু প্রভাবশালী সদস্য, যা দেশটিকে ক্রমেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, ব্যাপক অর্থ এবং উচ্চ ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে ইমরান শিবিরের আনুগত্য কিনে নিয়েছে পাকিস্তানের দুর্নীতিবাজ প্রাক্তন শাসক নওয়াজ শরীফের জোট।
ইমরানবিরোধী শিবির যখন একদিকে তার ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে, তখন দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া এবং ডিজি (আইএসআই) লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আঞ্জুমসহ চারজন সিনিয়র পাকিস্তানি জেনারেল ওআইসি-সম্মেলনের পরপরই ইমরানকে পদত্যাগ করতে বলেছেন বলে খবর রটেছে। এমনকি, পিটিআইর ঘনিষ্ঠ আলোচিত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফও ইমরান খানের পক্ষে সেনাবাহিনীর সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে দৃশ্যত ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এমতাবস্থায় ইমরান খান দলত্যাগী নেতাদের ক্ষমতাসীন পিটিআইয়ে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তিনি তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থনকারীদের একজন সহানুভূতিশীল পিতার মতো ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত।’ রবিবার এক জনসমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় ইমরান পিটিআইর বিদ্রোহী সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, ‘দলে ফিরে আসুন অথবা সামাজিক বয়কটের মুখোমুখি হোন। মানুষ আপনাদের বিশ্বাস করবে না। তরুণরা দেশে যা ঘটছে তা সম্পর্কে সচেতন, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ যেখানে কোনো কিছু গোপন করা কঠিন।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী ইমরান দলত্যাগী নেতাদের ‘বিবেক বিক্রি’ করে এবং দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মারাত্মক পরিণতির জন্য সতর্ক করে বলেন, ‘এ টাকা গ্রহণ করে আপনি আপনার সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছেন।’ ইমরান বলেন, ‘দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বা বিবেকের সঙ্গে আপস করে যদি সরকার বাঁচাতে হয়, তাহলে আমি এমন সরকারকে অভিশাপ দিই।’
ইমরান তার বিরোধীদের ‘ভ-’ উল্লেখ করে বলেন, তারা কখনোই তাদের জাতির পক্ষে দাঁড়াতে পারবে না; কারণ তারা টাকার পূজা করে। ইমরানের মতে, জাতি কখনোই উন্নতি করবে না যদি এটি বিশ্বের পরাশক্তির ‘দাস’ থেকে যায় এবং কেবল তখনই উন্নতি করবে যখন এটি নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
ভরসা আদালত
ক্ষমতাসীন দল পিটিআইয়ের কমপক্ষে ২৪ সংসদ সদস্য বিদ্রোহ করেছেন। তারা বিরোধীদের সঙ্গে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমতাবস্থায় ইমরান তাদেরকে দলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাতেও কোনো লাভ না হওয়ায় সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন অ্যাটর্নি জেনারেল খালিদ জাভেদ খান। তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল এক রেফারেন্স উত্থাপন করেন আদালতে। সংবিধানের ৬৩ ধারার ‘ক’ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে আদালতের মতামত চেয়েছেন তিনি। দলত্যাগী পার্লামেন্ট সদস্যদের অযোগ্য করার বিষয়ে এই ধারায় সিদ্ধান্ত হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল যে রেফারেন্স উত্থাপন করেছেন অনুচ্ছেদের ৬৩-এর ‘ক’ ধারায় তাতে দুটি ব্যাখ্যার সুযোগ আছে। তার মধ্যে কোনটি ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে আদালতের মতামত চাওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের দলত্যাগবিষয়ক (ফ্লোরক্রসিং) আইনে বলা আছে, সংসদ সদস্যরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাদের আসন হারাতে পারেন।
পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি আইন অনুযায়ী, কোনো এমপি যদি পার্লামেন্টে তার পার্টির বিরুদ্ধে ভোট দেন, সেক্ষেত্রে আইনসভায় তার সদস্যপদ বাতিল হয়; কিন্তু টিআইপির পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনসভার সদস্যপদ বাতিলের পাশাপাশি, তাদের ভোটও যেন গণনার অযোগ বলে ঘোষণা করা হয়।
পাকিস্তানের আদালতের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দ্বন্দ্বও সর্বজনবিদিত। একাধিকবার আদালতের সঙ্গে লড়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর নজির রয়েছে ইতিহাসে। এমতাবস্থায় আদালতে ইমরান কতটা সুরক্ষা পাবেনসেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিরোধীদের অস্বাভাবিক ঐক্য
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানে হঠাৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান (নওয়াজ) মুসলিম লীগ ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি এক হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নেতা মাওলানা ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ১৩টি দল নিয়ে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট-পিডিএম নামে মহাজোট গঠন করে। এই জোট ২০২১ সালের শুরুতে ইমরানের পদত্যাগের দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চ করে। এবার এই জোটের উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলো সংসদে।
শত্রু মনোভাবাপন্ন পাকিস্তানের বৃহৎ দুই বিরোধী দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে আসলে কোন খেলা রয়েছে তা বোধগম্য নয়। এর আগে সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে এই দুই দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। পরে জারদারি প্রেসিডেন্ট হয়ে মেয়াদ পূরণ করতে পারলেও, নওয়াজ প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। এখন পিডিএমে পিপিপির বিলাওয়াল ভুট্টো ও নওয়াজ কন্যা মরিয়ম সমান্তরালভাবে সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। অনাস্থা প্রস্তাবে ইমরানের সরকারের পতন হলে, ক্ষমতার ভাগাভাগি কোন পদ্ধতিতে হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। তবে বিরোধী মহলে একটা সাজসাজ রব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে চলমান পরিস্থিতিই যে পাকিস্তানের নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণ, কিংবা এটাই সমাধানের পথ তা মনে হয় না। সামনে রয়েছে আরও নতুন খেলা। আপাতত অপেক্ষা শুক্রবারের।
শঙ্কা সেনা শাসনের
বিরোধীরা বলছেন, ইমরান খান সময় নষ্ট করার কৌশল অবলম্বন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। অনাস্থা ভোটে বিজয় নিশ্চিত করতে বিরোধীদের অপহরণ করা হতে পারে এমন আশঙ্কাও করছেন তারা। এদিকে আগামী ২৭ মার্চ ইসলামাবাদের রেড জোনে আলাদা দুটি সমাবেশ ডেকেছে সরকারি দল পিটিআই ও বিরোধী দলগুলো। সরকারবিরোধী নেতারাও একে একে ইসলামাবাদে আসতে শুরু করেছেন। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে প্রবল সংঘর্ষের আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সংঘর্ষের কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কী হবে? উত্তর একটাই, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী আবার চলে আসতে পারে ক্ষমতায়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী নেতারাও বারবার দাবি করছেন, ইমরান খান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সমর্থন হারিয়েছেন। সরকার ও সামরিক বাহিনী অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে সমালোচকরা পাকিস্তানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দক্ষিণ এশীয় এই দেশটিতে তার ৭৪ বছরের ইতিহাসে চারটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। সামরিক বাহিনীর জেনারেলরা নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি-সম্পর্কিত বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে চলেছেন বলে মন্তব্য করছেন পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পাকিস্তান সেনার সঙ্গে পেরে উঠছেন না ইমরান খান। পাকিস্তানের ইতিহাস বলছে, পাকিস্তানের মসনদে টিকে থাকতে গেলে পাক সেনার সঙ্গে সমঝোতা থাকা জরুরি। সেই সমঝোতার মধ্য দিয়েই সাড়ের তিন বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিলেন ইমরান খানও।