‘স্বাধীনতার পর ৫০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩ ভাগের ২ ভাগ আদিবাসী দেশ ত্যাগ করেছে। আর যারা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তাদের জীবন জরাজীর্ণ। যারা দেশে বসবাস করছেন ভবিষ্যতে তাদের বসতভিটা থাকবে কি না তা নিয়েও সংশয়ে আছে’।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আদিবাসীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ দিনাজপুর জেলা কমিটির সভাপতি শীতল মার্ডি এসব বলেন।
তিনি বলেন, আমার বাড়ি বীরগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর মোহনপুর ইউনিয়নের মাটিয়াকুড়া গ্রাম। এ গ্রামে স্বাধীনতার পর প্রায় দেড় শ পরিবারের বসবাস ছিল। কিন্তু আজ সেখানে ৫৫টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস রয়েছে। অথচ দেড় শ পরিবারের জমি আছে, রেকর্ড, সিএস সবই আছে। কিন্তু পরিবারগুলো নাই। তাহলে আমরা ধরেই নেব এ গ্রাম থেকে ১০০ পরিবার দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি- এর মধ্যে কিছু পরিবার অন্যত্র বসবাস করছে। আর বাকি সব পরিবার ভারতে চলে গেছে। আদিবাসীদের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে বা দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে’।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রবিউল আওয়াল খোকা, বাসদের দিনাজপুর সমন্বয়ক কিবরিয়া হোসেনসহ আদিবাসী পরিষদের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শীতল মার্ডি বলেন, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় আদিবাসী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে সাঁওতাল, মুন্ডা, রাজোয়ার, তুরি, কর্মকার, মালো, মাহাতো, মালপাহাড়িয়া, গন্ড, পাটনি, বাগদি, মাহালী, ডহরা, ভুমিজ, আঙ্গুয়ার, রাজোয়াড, বেতিয়া, নুনিয়াহাড়ি, পাহাড়িয়া, ভুইয়া, বাগদী, রবিদাস, রাই, বেদিয়াসহ ৩৮টি জাতিসত্তা রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ দেশের আদিবাসীদের বিশাল অবদান রয়েছে। এই দেশ স্বাধীন করতে অনেক আদিবাসী জীবন দিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনের পর নিজ দেশে আদিবাসীরা নিজের বাড়ি-ঘর, চাষের জমি, ভিটা-মাটি দখল হয়ে গেছে। যা আজ পর্যন্ত ফেরত পায়নি’।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সময়ে আদিবাসীদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমাগতভাবে চরম অবনতি ঘটছে। আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা দিনদিন আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। একশ্রেণির ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, জাল দলিল, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলা, লুটপাট, জবর দখল, দেশ ত্যাগে বাধ্যসহ নানা নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে বিশেষ কার্যক্রম ঘোষণা করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মীয় নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ এবং তাদের ভূমি, বসতভিটা, বনভূমি, জলাসহ অন্যান্য সম্পত্তির পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিতের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আদিবাসী পরিষদের পক্ষ থেকে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী ১৮ মে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় আদিবাসী সমাবেশ, জেলা প্রশাসক কার্যালয় ঘেরাও ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।
১৫ দফা দাবি হলো-সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন, আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, দখলি শর্তে খাস জমি, বসতভিটা, কবরস্থান, পুকুর আদিবাসীদের নামে প্রদান, বনায়নের নামে আদিবাসীদের জমি বন বিভাগের দখল ও মামলা-হয়রানি থেকে মুক্ত করা, আদিবাসীদের জমি তাদের কাছে হস্তান্তরের রক্ষাকবচকে আরো কঠোর করাসহ বিনা পারমিশনে যেসব দলিল তৈরি হয়েছে তা বাতিল করা, সব আদিবাসীর নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমপক্ষে একজন করে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ, আদিবাসীদের জন্য উচ্চ শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ করা, দিনাজপুর ও নওগাঁয় প্রতিষ্ঠিত আদিবাসী একাডেমিতে দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং রাজশাহী বিভাগীয় আদিবাসী একাডেমিতে উপপরিচালক পদে আদিবাসীদের মধ্য থেকে নিয়োগ, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, জাতীয় সংসদে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের জন্য চারটি সংরক্ষিত নির্বাচনী এলাকা গঠনে আইন প্রণয়ন ও দুটি সংরক্ষিত আদিবাসী নারী আসনের ব্যবস্থা করা, আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, আদিবাসীদের ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক রক্ষা-চর্চার অনুকূল পরিবেশ, গবেষণার ক্ষেত্রে প্রস্তুতসহ আদিবাসী একাডেমি গঠন, সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি প্রকৃত জমি মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া ও ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার এবং ক্ষতিপূরণ, আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে কোনো ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সরকারকে আদিবাসীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।